বাংলাদেশের সরকারি কেনাকাটার তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার তাগিদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে সরকারি আয়-ব্যয়ের তথ্য বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকাশ, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের চুক্তি ও লাইসেন্সের তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়াতে আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশিত ‘২০২৬ ফিসক্যাল ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট: বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে এসব পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যালোচনাকালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়াতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। বছরের শেষের প্রতিবেদন যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে প্রকাশ করা এবং প্রস্তাবিত ও অনুমোদিত বাজেট জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। বাজেট অনলাইনেও প্রকাশ করা হয়েছে।
আরও বলা হয়, বাজেটে থাকা তথ্যকে মোটের ওপর নির্ভরযোগ্য মনে করা হলেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা অনুসরণ করে বাজেট নথি তৈরি করা হয়নি। সরকারের ঋণের দায়-দায়িত্বসংক্রান্ত তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
সরকারের পরিকল্পিত আয় ও ব্যয়ের মোটামুটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র বাজেট নথিতে পাওয়া গেলেও সেখানে নির্বাহী কার্যালয়গুলোর জন্য করা ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব দেওয়া হয়নি। ফলে সরকারের মোট আয় ও ব্যয়ের পুরোপুরি পূর্ণাঙ্গ চিত্রও বাজেট থেকে পাওয়া যায় না।
বাজেটের নথিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকারের আর্থিক বরাদ্দ এবং এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের আয়ের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে সরকারের রাজস্বের তথ্যও বাজেটে রাখা হয়েছে।
তবে সরকারি হিসাব নিরীক্ষার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি হিসাব পর্যালোচনা করেনি। যদিও প্রতিষ্ঠানটি কিছু সংক্ষিপ্ত নিরীক্ষা-ফলাফল প্রকাশ করেছে এবং সেগুলো যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে জনসম্মুখে এসেছে। কিন্তু ওই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি।
প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্য চুক্তি ও লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার আইন ও বিধিমালায় নির্ধারিত মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এসব চুক্তি ও লাইসেন্সের বিষয়ে জনসাধারণের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রেও তথ্য প্রকাশে ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবেদনে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তির তথ্য প্রকাশের সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি কেনাকাটার মৌলিক তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত ওয়েবসাইটে প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার আরও সহজ ও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেসব সংস্কারের সুপারিশ
বাংলাদেশের আর্থিক স্বচ্ছতা আরও উন্নত করতে প্রতিবেদনে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা অনুসরণ করে বাজেট নথি তৈরি করা এবং বাজেটে সরকারের আয় ও ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা।
এ ছাড়া অনুমোদিত বাজেটের সঙ্গে প্রকৃত আয় ও ব্যয়ের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাজেটে যে পরিমাণ আয় ও ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়, বাস্তবে তা যেন তার সঙ্গে যুক্তিসংগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
সরকারের সর্বোচ্চ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা এবং পুরো বার্ষিক বাস্তবায়িত বাজেটে সময়মতো ও সরাসরি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশের পাশাপাশি তাতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, সুপারিশ ও বিস্তারিত বিবরণ রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের চুক্তি ও লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে মৌলিক তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা এবং সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তির তথ্য প্রকাশের সুপারিশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
সামগ্রিকভাবে, প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আর্থিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতির কথা স্বীকার করা হলেও বাজেটের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের চুক্তির তথ্য এবং সরকারি কেনাকাটার তথ্য উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে আরও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে তুলে ধরা হয়েছে।