যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কয়েক দশকের শত্রুতা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা যে কোনো মুহূর্তে একটি বিধ্বংসী যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযানের অনুমোদন দিতে পারেন। তবে এই সম্ভাব্য যুদ্ধের যৌক্তিকতা বা পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে গভীর ধোঁয়াশা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
ট্রাম্পের দোদুল্যমানতা ও সামরিক প্রস্তুতি: সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী হোয়াইট হাউসকে জানিয়েছে, তারা এই সপ্তাহান্তেই ইরানে হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত। গত কয়েক দিনে এই অঞ্চলে বিমান ও নৌবাহিনীর শক্তি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এই অভিযানের পক্ষে এবং বিপক্ষে নানা যুক্তি দিচ্ছেন। তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা এবং মিত্রদের মতামত নিচ্ছেন, কিন্তু এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।

যৌক্তিকতার অভাব ও জনমতের চাপ: আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বড় একটি যুদ্ধের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মার্কিন জনগণের সামনে এর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা লক্ষ্য ব্যাখ্যা করা হয়নি। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কারোলিন লেভিটকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, কেন এই হামলা প্রয়োজন, তখন তিনি কোনো নির্দিষ্ট কারণ না দেখিয়ে কেবল বলেন, হামলার পেছনে অনেক যুক্তি থাকতে পারে।
সমালোচকরা বলছেন, ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের আগে বুশ প্রশাসন যেভাবে জনমত গঠনের চেষ্টা করেছিল, ট্রাম্প প্রশাসনকে তেমন কিছু করতে দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে, কোনো কারণে এই অভিযান ব্যর্থ হলে বা মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ঘটলে ট্রাম্প চরম রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়বেন।
হামলার সম্ভাবনাই বেশি: বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প বর্তমানে ইরানকে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় দেখছেন। এর কয়েকটি কারণ হলো- আঞ্চলিক শক্তির ক্ষয়; ইরানের প্রধান প্রক্সি শক্তিগুলো, যেমন গাজা ও লেবাননের গোষ্ঠীগুলো, ইসরায়েইর হামলায় বর্তমানে বিপর্যস্ত।
অভ্যন্তরীণ সংকট; ইরানের ভেতরে চরম অর্থনৈতিক মন্দা এবং বিক্ষোভের কারণে দেশটির শাসনব্যবস্থা চাপে রয়েছে। উত্তরসূরি রক্ষা; ট্রাম্প হয়তো ১৯৭৯ সাল থেকে চলে আসা এই শত্রুতার অবসান ঘটিয়ে ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ী করতে চাইছেন।
সম্ভাব্য ঝুঁকি ও অশুভ পরিণাম: যদিও ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক সফল অভিযানের পর ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, তবে ইরান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কয়েক সপ্তাহব্যাপী বিমান হামলা চালালে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। এছাড়া, যদি ইরানের বর্তমান সরকার পতনের দিকে যায়, তবে সেখানে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণ করবে কে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

ইরাক বা লিবিয়ার মতো সেখানেও যদি দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধ বা চরমপন্থী শক্তির উত্থান ঘটে, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে।
কূটনীতির শেষ সুযোগ: ইরান চাইছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিনিময়ে কয়েক বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখতে। কিন্তু ট্রাম্পের কাছে এটি গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ তিনি ওবামা আমলের পরমাণু চুক্তির মতো কোনো সমঝোতায় ফিরতে চান না। অন্যদিকে, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে নারাজ। এই অচলবস্থাই মূলত যুদ্ধের পথকে প্রশস্ত করছে।
মঙ্গলবার ট্রাম্পের 'স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন' ভাষণ এবং মুসলিমদের পবিত্র রমজান মাসে এই হামলা হবে কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ট্রাম্প যদি ইরানকে তাঁর শর্তে রাজি করাতে না পারেন, তবে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর সিদ্ধান্তটি হয়তো শিগগিরই নিতে হবে।
ইরানে মার্কিন হুমকি প্রতিহতে ধেয়ে আসছে রুশ রণতরি