৩১২ কোটি টাকা খরচেও কাজ করে না অগ্রণী ব্যাংকের সফটওয়্যার

বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করেও সফটওয়্যার আপগ্রেড করতে পারেনি অগ্রণী ব্যাংক। ৩১২ কোটি টাকা খরচের পরও গুণতে হচ্ছে বিপুল লোকসান। উল্টো, এসব কাজে অনিয়মের মাধ্যমে ৯১ কোটি টাকার বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয় ফ্লোরা টেলিকমকে। যার পুরোটাই এখন ক্ষতির তালিকায়। মূলত আওয়ামী আমলে বিপুল এই অর্থ অপচয় করেন সে সময়ের কর্মকর্তারা।

অগ্রণী ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে ৩ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব

দেশের ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আইটি ও সফটওয়ার সার্বিস দিয়ে থাকে আইটি প্রতিষ্ঠান ফ্লোরা টেলিকম। একইভাবে প্রতিষ্ঠানটি আইটি সহায়তা দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ব অগ্রণী ব্যাংককেও। তবে ফ্লোরা টেলিকমকে ঘিরে অগ্রণী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠাটির সঙ্গে অসম চুক্তি এবং অবৈধভাবে সুবিধা দিয়ে অন্তত ৯১ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে অগ্রণী ব্যাংক।

দুর্বল সিস্টেমে দেড় দশকে অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষতি ২ হাজার কোটি টাকা

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত পরিবর্তন, ব্যাকডেটে চুক্তি কার্যকর ও অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ ফি পরিশোধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের সংশোধিত চুক্তি ২০২০ সাল থেকে কার্যকর দেখিয়ে ব্যাংকের ৫ কোটি টাকা ক্ষতি করা হয়। এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী ফ্লোরার বহন করার কথা থাকা ৪৪ শতাংশ করের বোঝাও ব্যাংকের ওপর চাপানো হয়। ১৭টি সফটওয়্যার মডিউলের ৬টি সক্রিয় না হলেও পরিশোধ করা হয় ৬০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ফ্লোরা টেলিকম-সংক্রান্ত অনিয়মে ব্যাংকের ৯১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ক্ষতির হিসাব দিয়েছে নিরীক্ষক দল।

এদিকে কোর ব্যাংকিং সিস্টেম, টেমেনস টি-২৪ সফটওয়্যার ও বিভিন্ন প্রযুক্তি সেবায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পায়নি অগ্রণী ব্যাংক। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে টেমেনস টি-২৪ সফটওয়্যার নিয়ে। দীর্ঘদিন পুরোনো আর-০৯ ভার্সন ব্যবহার করায় ব্যাংককে অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ ফি দিতে হয়েছে। পরে আর-০৯ থেকে আর-২০ ভার্সনে উন্নীত করতে ৬৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৭টি নতুন মডিউল ও বিভিন্ন সেবা কেনা হয়। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও বাস্তবায়ন হয়নি টি-২৪ আপগ্রেডেশন। এ জন্য ফ্লোরা টেলিকমকে দেওয়া হয় ৬০ কোটি টাকা লাইসেন্স ফি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাগজে-কলমে অগ্রগতি, টাকা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা

টি-২৪-এর আর-২০ ভার্সন ও আইএসবি বাস্তবায়নে থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেমের মাধ্যমে আরও ৬৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা হয় আইবিএম হার্ডওয়্যার ও তিনটি সার্ভার। কিন্তু এসব যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। এমনকি ব্যবহারের আগেই এগুলোর ওয়ারেন্টি মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে অভিযোগে।

এদিকে ফ্লোরা টেলিকমকে ঘিরে রয়েছে আরও গুরুতর অভিযোগ। ২০১৮ সালে টি-২৪ লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ২০১৮ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরের একক উৎসের চুক্তি করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের একটি সালিসি মামলার পর্যবেক্ষণেও ফ্লোরাকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রায় ৬ কোটি টাকার সেবার বিপরীতে অগ্রণী ব্যাংক বছরে প্রায় ১২ কোটি টাকা পরিশোধ করছিল। এরপর ব্যাংকের পর্ষদ ফ্লোরার বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ফি ২১ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা আবার বাড়িয়ে করা হয় ২০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এই বর্ধিত চুক্তি ২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর দেখিয়ে ফ্লোরাকে ৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকার বেশি বকেয়া বিলও পরিশোধ করা হয়।

সামিট গ্রুপের রেকর্ড ২ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি

এখানেই শেষ নয়। ২০০৮ সালের মূল চুক্তিতে কর ও ভ্যাট বহনের দায় ছিল ফ্লোরা টেলিকমের ওপর। কিন্তু পরবর্তী সংশোধিত চুক্তিতে ৪৪ শতাংশ রেমিট্যান্স চার্জ বা টিটিআই ব্যাংকের ওপর চাপানো হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, ব্যাকডেটে এটি কার্যকর দেখানোর ফলে ব্যাংকের প্রায় ৫০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি টেমেনসকে পাঠানো অর্থের ওপর আইন অনুযায়ী উৎসে কর না কেটে হিসাব সমন্বয়ের মাধ্যমে ফ্লোরাকে কম টিডিএস দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা সুবিধা পেয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান একাত্তরকে বলেন, এই অনিয়মের ইস্যুটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্সপেকশন পরিদর্শন প্রতিবন্ধনে বের হয়েছে। সেই সাথে নিরীক্ষক দল দ্বারাও এগুলো উদ্ঘাটিত হয়েছে যেখানে বড় অনিয়ম ধরা পড়েছে। এমন বড় অনিয়ম একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাদিন ব্যাংকের ক্ষেত্রে কখনোই গ্রহণযোগ্য না।

সব মিলিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের আইটি খাতে ৩১২ কোটি টাকা ব্যয় হলেও হয়নি কাঙ্ক্ষিত সফটওয়্যার আপগ্রেড। চুক্তির শর্ত পরিবর্তন, একক উৎসে ক্রয়, ব্যাকডেটে চুক্তি কার্যকর, অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ এবং কর ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্ন উঠেছে ব্যাংকের আইটি ব্যবস্থাপনা ও ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। এখন এসব অভিযোগের দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই বড় প্রশ্ন।