দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধি বাড়াতে নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট বা স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৬ সালের জুন প্রান্তিক শেষে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকায় খোলা নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট, স্টুডেন্ট ব্যাংকিং, পথশিশু ও কর্মজীবী শিশুদের হিসাব মিলিয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬৬ লাখ ৪৮ হাজার ১১৯টি। এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ১০ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন বিভাগের ‘নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন (এপ্রিল-জুন ২০২৬)’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। স্বল্প আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় আনতে এসব হিসাবের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্টুডেন্ট ব্যাংকিং ও পথশিশুদের হিসাব বাদ দিলে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকায় খোলা নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৭টি। এসব হিসাবে জমা রয়েছে ৫ হাজার ৪৯০ কোটি ৯২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। একই সময়ে আমানতের পরিমাণ আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে ৯ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।
১০, ৫০ ও ১০০ টাকার নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের সবচেয়ে বড় অংশ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের। এ শ্রেণিতে রয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৮টি হিসাব, যা মোট হিসাবের ৩৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন কৃষকরা। তাদের নামে রয়েছে ১ কোটি ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৮৫৯টি হিসাব, যা মোটের ৩৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। চরম দরিদ্রদের নামে রয়েছে ৩৫ লাখ ১০ হাজার ২৯২টি হিসাব বা ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাগজে-কলমে অগ্রগতি, টাকা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা
এছাড়া তৈরি পোশাকশ্রমিকদের নামে রয়েছে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৮০১টি হিসাব, যা মোটের ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে রয়েছে ১ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং অন্যান্য শ্রেণির মানুষের নামে রয়েছে ৯ দশমিক ১৯ শতাংশ হিসাব।
এদিকে কৃষকদের হিসাবের সংখ্যা সামান্য বাড়লেও তাদের জমার পরিমাণ কমেছে। জুন প্রান্তিক শেষে কৃষকদের হিসাবে জমার পরিমাণ ১০ দশমিক ৩৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭৭৭ কোটি ৫৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা। অন্যদিকে চরম দরিদ্রদের হিসাব ৩৫ লাখ ১০ হাজার ২৯২টিতে পৌঁছেছে এবং তাদের সঞ্চয় বেড়ে হয়েছে ২৯২ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের হিসাবও বাড়ছে। জুন প্রান্তিক শেষে এ ধরনের হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৮টি। আগের প্রান্তিকের তুলনায় হিসাব বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে ১ দশমিক ৯১ শতাংশ। এসব হিসাবে জমার পরিমাণ ২ হাজার ১০৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি।
ব্যাংক খাত সংস্কার ও একক ভ্যাটহারে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা চায় আইএমএফ
তৈরি পোশাকশ্রমিকদের নো-ফ্রিল হিসাবেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুন শেষে এ ধরনের হিসাব দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৮০১টিতে। আগের প্রান্তিকের তুলনায় হিসাব বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। এসব হিসাবে জমা রয়েছে ৫১৮ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সও বাড়ছে। জুন প্রান্তিক শেষে এসব হিসাবের মাধ্যমে পুঞ্জীভূত রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে মোবাইল আর্থিক সেবাসহ ডিজিটাল মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বাড়ায় আগের প্রান্তিকের তুলনায় এ অর্থের পরিমাণ ১ দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে।
এদিকে স্টুডেন্ট ব্যাংকিং হিসাবেও বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নতুন নির্দেশিকার পর এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নতুন করে ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯৪০টি স্টুডেন্ট ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয়েছে। জুন শেষে মোট স্টুডেন্ট ব্যাংকিং হিসাব দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৫টিতে। এসব হিসাবে জমা রয়েছে ৩ হাজার ৫১৮ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় আমানত বেড়েছে ২০ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
নতুন নীতিমালায় ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং হিসাব খোলার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ‘এক শাখা, এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান’ নীতির আওতায় ব্যাংকগুলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৯টি ব্যাংক স্টুডেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে।
চূড়ান্তের পথে নবম পে স্কেল, যে কোনো সময় বাস্তবায়ন
স্টুডেন্ট ব্যাংকিংয়ে শহরাঞ্চলের হিসাবের অংশ ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলের ৪৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। লিঙ্গভিত্তিক হিসাবে ছাত্রদের অংশ ৫৪ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৪৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ব্যাংকের ধরন অনুযায়ী বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ হিসাব এবং ৮১ দশমিক ৩৮ শতাংশ আমানত ধরে রেখেছে।
স্টুডেন্ট ব্যাংকিংয়ে হিসাবের সংখ্যার দিক থেকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংক শীর্ষ পাঁচে রয়েছে। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি স্টুডেন্ট ব্যাংকিং হিসাব রয়েছে। এ বিভাগের হিসাবের অংশ ২২ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং আমানতের অংশ ৩৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ।
নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষের ঋণ প্রাপ্তির সুযোগও তৈরি হয়েছে। ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার হিসাবধারীদের জন্য জামানতবিহীন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ৫০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ কোটি টাকা করা হয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার ৭ শতাংশ এবং ব্যাংক পর্যায়ে ১ শতাংশ। একজন গ্রাহক ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। মোট ঋণের অন্তত ২৫ শতাংশ নারী গ্রাহকদের দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
জুন ২০২৬ পর্যন্ত এ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় ১ লাখ ৯ হাজার ৬৯৭ জন গ্রাহককে মোট ৯৭২ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকের ধরন অনুযায়ী ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবদান সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকের হিসাবের অংশ ৫০ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং মোট আমানতের অংশ ৬১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। হিসাবের সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষ পাঁচ ব্যাংক হলো সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও জনতা ব্যাংক। এই পাঁচ ব্যাংকের হিসাব মিলিয়ে মোটের ৭৭ দশমিক ৩০ শতাংশ।
আমানতের দিক থেকে শীর্ষ পাঁচ ব্যাংক হলো অগ্রণী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংকে মোট নো-ফ্রিল আমানতের ৮১ দশমিক ৭৩ শতাংশ রয়েছে।
দুর্বল সিস্টেমে দেড় দশকে অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষতি ২ হাজার কোটি টাকা
পথশিশু ও কর্মজীবী শিশুদের ব্যাংকিংয়েও অগ্রগতি হয়েছে। জুন শেষে ১৮টি ব্যাংক ৪৯টি এনজিওর সহযোগিতায় এ ধরনের ৪০ হাজার ৬০৭টি হিসাব খুলেছে। এসব হিসাবে মোট জমা রয়েছে ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬০ টাকা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি হিসাব খুলেছে অগ্রণী ব্যাংক। আর আমানতের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জুন পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন ভর্তুকি ও বেতন-ভাতা পেয়েছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ৭১ লাখ ৮৯ হাজার ২৯১ জন। ফলে এসব হিসাব শুধু সঞ্চয়ের মাধ্যম নয়, সরকারি সহায়তা ও রেমিট্যান্স পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও কাজ করছে।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও বাড়াতে প্রতিবেদনে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নারী, যুব ও স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য আর্থিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক শাখাগুলোতে নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট খোলার নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের অগ্রাধিকার, এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে শুধু হিসাবের সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে এসব হিসাব কতটা সক্রিয়, কত ঘন ঘন লেনদেন হচ্ছে ও গ্রাহকদের সঞ্চয়ের আচরণ কেমন—এসব বিষয়ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য সমন্বিত কাঠামো তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
