রেস্তোরাঁয় ভরপুর ভবনকে টাইমবোমা বললেন স্থপতি!

সম্প্রতি বেইলি রোডের একটি রেস্তোরাঁয় ভর্তি ভবনে আগুন লেগে অর্ধশত মানুষ পুড়ে মারা যাওয়ার ঘটনার পর রাজধানীজুড়ে এমন আরও অসংখ্য ভবন রয়েছে উল্লেখ করে সেগুলোকে ‘টিকিং টাইমবোম্ব’ বলে মন্তব্য করেন স্থপতি, শিল্পী ও স্থাপত্য বিষয়ক পত্রিকা ‘ডট’র সম্পাদক মুস্তাফা খালিদ পলাশ।

শুক্রবার রাতে একাত্তর টেলিভিশনের সম্পাদকীয় প্রধান নূর সাফা জুলহাজের সঞ্চালনায় একাত্তরের নিয়মিত আয়োজন ‘একাত্তর মঞ্চে’ যুক্ত হয়ে এ মন্তব্য করেন দেশবরেণ্য এই স্থপতি।

একটি বাণিজ্যিক ভবন কিভাবে রেস্টুরেন্ট ভবন হয়ে উঠছে তার নজির হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকার সাতমসজিদ রোডে দৃষ্টিনন্দন ও অভিজাত স্থাপনা ‘গাউসিয়া টুইনপিক’র কথা। ব্যতিক্রম ডিজাইনে ফেয়ার ফেস কংক্রিট ও গ্লাসে আবৃত স্থাপনাটি নজর কাড়ে যে কারোর। স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশের প্রতিষ্ঠান ভিসতারা আর্কিটেক্টস এই স্থাপনার ডিজাইন করেছে। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভবনটিতে সাধারণ মানুষকে না যাওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন খোদ স্থপতি নিজেই!

ভবনমালিক ও ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্থপতির নির্দেশনা না মেনেই স্থাপনাটিকে অনিরাপদভাবে ব্যবহার করছেন, যা মানুষের জানমালের জন্য হুমকিস্বরূপ। এজন্য নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কেউ যেন সেখানে না যান, এমন বার্তা দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

একাত্তরের প্রতিবেদক নয়ন আদিত্য গাউসিয়া টুইনপিক পরিদর্শন করে জানান, কমার্শিয়াল স্পেস হিসেবে ডিজাইন করা এই ভবনটিতে অন্তত ২৫টি রেস্টুরেন্ট রয়েছে, এর প্রতিটি ফ্লোরেই একা বা একাধিক রেস্টুরেন্ট।

সরেজমিনে দেখা যায়, ফায়ার ডোরগুলো খুলে ফেলে সিঁড়ির অংশেও তৈরি করা হয়েছে স্টোররুম। বিভিন্ন তলার সিঁড়িতে নানারকম জিনিসপত্র রেখে তৈরি করা হয়েছে প্রতিবন্ধকতা। রেস্টুরেন্টের নানা মালামালের সাথে সাথে সেখানে রয়েছে গ্যাস সিলিন্ডারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জিনিসও। পুরো ভবনটির প্রতি তলাতেই রয়েছে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্থাপিত রান্নাঘর। সেই রান্নাঘরগুলোর তাপ বের করে দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বলে স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্টরাও।

এটা কেবলই হিমশৈলের অগ্রভাগ উল্লেখ করে তিনি জানান, সাত মসজিদ রোডে এটা অপেক্ষাকৃত নতুন স্থাপনা। আরও অনেক স্থাপনা রয়েছে এবং যেগুলোতে হাজার হাজার রেস্টুরেন্ট রয়েছে।

এরকম ভবনভর্তি রেস্টুরেন্ট শুধু এখানেই নয়, বনানীর ১১ নম্বরে, বেইলি রোডে, খিলগাঁওয়ে এবং রাজধানীর আরও অনেক জায়গাতেই চোখে পড়ে। এরকম ভবনগুলো রীতিমতো ‘টিকিং টাইমবোম্ব’ বলে মন্তব্য করে সেগুলোর তুলনায় বেইলি রোডের পুড়ে যাওয়া ভবনকে বরং হাতবোমা বলেন তিনি। 

বেইলি রোডের ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে স্থপতি পলাশ বলেন, বেইলি রোডের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছেই। এটা নতুন কিছু নয়। যতদিন ফেসবুক ফিডে এ ঘটনা ঘুরে বেড়াবে, আমরা ততদিন এটা মনে রাখবো, তারপর বেমালুম ভুলে যাবো। সবাই ভুলে যাবে। আমরা জাতিগতভাবে এমন হয়ে গেছি!

তিনি বলেন, কোথায় তদন্ত কমিটি, কিসের রিপোর্ট, কে ধরা পড়লো, কারও শাস্তি হলো কিনা- তার কোনো খোঁজ থাকবে না। এটাই প্রতিনিয়ত ঘটছে, ক্রমান্বয়ে এই ব্যত্যয়টাই আমাদের সিস্টেমে পরিণত হয়েছে।

সিস্টেমের সমস্যা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, বেইলি রোডের এই যে ভবনটি, এটা কিন্তু বেশি উঁচু নয়, একটি সাততলা ভবন। এ ভবনটি নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সাথে রাজউকের মতনৈক্য আছে। রাজউক বলছে, ১০ তলার বেশি উঁচু হলে সেক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা সনদ নিতে হবে। অথচ ফায়ার ডিপার্টমেন্ট বলছে, সাততলা বা তার চেয়ে উঁচু ভবন হলেই অগ্নিনিরাপত্তা সনদ জরুরী।

তিনি জানান, সাততলা ভবনের রাজউক অনুমোদনের জন্য ফায়ার সার্ভিসের সনদের প্রয়োজন পড়ছে না। এতে লক্ষ লক্ষ স্কয়ার ফিটের একটি শপিং মলও অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ছাড়াও রাজউকের অনুমোদন পেয়ে যাবে, কারণ সেটা ৩৩ মিটার বা ১০ তলার চেয়ে নিচে।

একজন স্থপতি হিসেবে তিনি ফায়ার সার্ভিসের সাথেই ঐক্যমত্য পোষণ করেন। এবং একটি একতলা টিনসেড বা কুঁড়েঘর হলেও তিনি অগ্নিনিরাপদ করে ডিজাইন করতে চান তিনি।

বেইলি রোডের ওই রেস্টুরেন্ট ভবন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমন একটি ভবন তো আর একদিনে গড়ে ওঠেনি। রাজউক হয়তো এরকম ভবনের অনুমতি দিয়েছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য। ফলে এরকম একটি ভবনে রেস্তোরাঁ করা যাবে। কিন্তু একটি ভবনে কয়টি রেস্তোরাঁ করা যাবে, ভবনভর্তি রেস্তোরাঁ করা যাবে কিনা, তা কিন্তু কোথাও বলা হয়নি। 

তিনি জানান, সাধারণত একেকটি ভবনের নকশা একেক রকম হয়। আবাসিক ভবন হলে একরকম, বাণিজ্যিক হলে আরেক। নীতিমালা-বিধিমালা মেনেই নকশা হয়, নকশা দেখে হয় অনুমোদন। কিন্তু নির্মাণের বেলায় গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই এটার ব্যত্যয় হয়। এরপর নির্মাণ ও অনুমোদন অনুযায়ী ব্যবহার হচ্ছে কিনা, সেটাও নিশ্চিত নয়।

ব্যবহারের ব্যত্যয়ের কারণে গাউসিয়া টুইনপিকের অকুপেন্সি সার্টিফিকেটের জন্য রিপোর্ট স্বাক্ষর করেননি জানিয়ে স্থপতি জানান, অকুপেন্সি সার্টিফিকেটের তোয়াক্কা না করেই এখানে চলছে ব্যবসা। জমির মালিক ও ডেভেলপারকে বারবার লিখিত বার্তায় এ বিষয়ে সতর্ক করা হলেও কোনো ফলপ্রসূ অগ্রগতি হয়নি বলে জানান তিনি। তারা উল্টো জানিয়েছেন, তাদের প্রয়োজনীয় সনদ রয়েছে।

স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ ডেলভিস্তা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ভিসতারা আর্কিটেক্টসের প্রধান। তিনি স্থাপত্যবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ডট’র সম্পাদক এবং পাশাপাশি চিত্রশিল্পী ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবেও সমাদৃত। ঢাকার বসুন্ধরা সিটি, জিপি হাউজ, র‌্যাংগস ব্যাবিলনিয়া, ওয়েস্টিন হোটেল, চট্টগ্রামের রেডিসন বে ব্লু হোটেলসহ দেশের বহু উল্লেখযোগ্য নান্দনিক স্থাপনার স্থপতি তিনি। একসময় তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। পরে নিজের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থাপত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন।