মনিরুলকে গুলি করার পর হাঁটাহাঁটি করছিলেন কাওসার!

শনিবার মধ্যরাত থেকেই ‘টক অব দ্য টাউন’ অভিজাত দূতাবাস পাড়ায় এক পুলিশের হাতে আরেক পুলিশ নিহত হবার চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এমন ঘটনায় গোটা পুলিশ বাহিনীরও ধাতস্ত হয়ে উঠতে সময় লাগছে। কি এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলো যে অভিযুক্ত কনস্টেবল কাওসার পাগলের মতো ছুড়তে হয়েছিলো?

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন জানিয়েছেন, ডিউটি খাতা নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ফিলিস্তিনের দূতাবাসে বাইরে, ডিউটি বক্সের সামনে একের পর এক গুলি করে পুলিশ  কনস্টেবল মনিরুলকে হত্যা করে তার সহকর্মী কন্সটেবল কাওসার। 

ঘটনার পরই অভিযুক্ত কাওসারকে আটক করে পুলিশ। রোববার তাকে আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার মূল কারণ জানার চেষ্টা চলছে। 

সিটিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ফিলিস্তিন দূতাবাসের সামনের পুলিশ বুথে কনেস্টবল কাওসার ও মনিরুলের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে তর্ক চলছে। এক পর্যায়ে হঠাৎ একটি খাতা ছুঁড়ে মেরে মনিরুলকে লক্ষ করে গুলি শুরু করে কাওসার। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আবারও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন মনিরুল। এ সময় আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করেন কাওসার। সড়কের উপরেই লুটিয়ে পড়েন মনিরুল। 

সহকর্মীর মৃত্যু নিশ্চিত করে অনেকটা স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই কিছুক্ষন তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন কাউসার। এ সময় জাপান দূতাবাসের এক গাড়ি চালক ঘটনাস্থলে এগিয়ে এলে তিনিও গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাস্থল থেকেই কাওসারকে আটক করে গুলশান থানা পুলিশ। 

পুলিশের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গুলি করার সময় তার অস্ত্রের একটি ম্যাগাজিন খালি হয়ে গেলে আরেকটি ম্যাগাজিন লাগিয়ে গুলি করেন। কনস্টেবল কাওসার সাব মেশিনগান দিয়ে দুটি ম্যাগাজিনের ৩৪ রাউন্ড গুলি চালান। মনিরুলের দেহ তাতে ঝাঁঝরা হলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

গুলশান থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, কাওসার সাব মেশিনগান এসএমটি-৯ দিয়ে মনিরুলের দেহে গুলি করেন। এ সময় তার অস্ত্রের একটা ম্যাগাজিন খালি হয়ে গেলে আরেকটি ম্যাগাজিন ভরে গুলি করেন। শনিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ফিলিস্তিন দূতাবাসের উত্তর পাশের গার্ডরুমের বাইরে ওই ঘটনা ঘটে।

সহকর্মীকে কেনো এভাবে গুলি করে হত্যা করলো একজন কন্সটেবল তাও আবার গুলশান বারিধারার মতো কূটনৈতিক এলাকায়; এই প্রশ্নের উত্তর খুজছেন তদন্তকারি কর্মকর্তারা। তবে উত্তর এখনও মেলেনি। হত্যার কারণ নিয়ে স্পষ্ট কোন তথ্য দেয়নি পুলিশ। কাওসারকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে আরও তথ্য জানা যাবে।

সিসিটিভির ফুটেজ দেখে প্রাথমিক ধারণা এবং নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান থেকে জানা গেছে, ডিউটিতে দেরি করে আসা নিয়ে সহকর্মীর সাথে তর্কাতর্কি থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত কারণ বের হবে বলে আশা করছেন গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার। 

তিনি বলেন, রাজধানীর বারিধারায় ডিপ্লোম্যাটিক জোনে ফিলিস্তিন দূতাবাসের সামনে ডিউটিরত কনস্টেবল মনিরুল হকের সঙ্গে কনস্টেবল কাওছার আলীর তর্কাতর্কির ঘটনা ঘটে। তর্কাতর্কির পর উত্তেজিত হয়ে কনস্টেবল কাওছার ৮-৯ রাউন্ড গুলি ছোড়েন সহকর্মী মনিরুলকে উদ্দেশ্য করে।

তবে কী নিয়ে তর্ক ও কী কারণে কনস্টেবল কাওছার উত্তেজিত ছিলেন সে বিষয়ে এখনো জানাতে পারেনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তদন্ত করে সেটি বের করা হবে বলে জানিয়েছে ডিএমপি। কনেস্টবল কাওসার আহমেদকে একমাত্র আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

খন্দকার মহিদ উদ্দিন আরও বলেন, দুই পুলিশ সদস্যের মধ্যে বিরোধ ছিলো, এমন তথ্য নেই। কাওসারের রের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি, কিন্তু বিরোধের কোনো তথ্য তার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি অভিযুক্ত কাওসারের গত এক-দুই মাসের ডিউটির রেকর্ড দেখেছি। যথাযথভাবেই সে ডিউটি করেছে।

ডিএমপির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে অভিযুক্ত কনস্টেবল কাওসার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। গুলি করেই তিনি হতভম্ব। এই কারণে বারবার বলছিলেন, এটা কীভাবে হয়ে গেলো। আমি জানি না। অর্থাৎ নিজের সহকর্মীকে এ ধরনের ঘটনা ঘটার পর মাসনিকভাবে নার্ভাস থাকে। 

তিনি আরও যোগ করেন, এ কারণেই ঘটনা ঘটানোর পরও অস্ত্র রেখে কনস্টেবল কাওসার সেখানে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। কারণ তিনি স্ট্রেসটা নিতে পারছিলেন না। ঘটনার পর তিনি বুঝতে পেরেছেন হয়তো কত বড় অন্যায় ও অমানবিক কাজ করেছেন। হয়তো দু’একদিন গেলে বোঝা যাবে গুলি করার কারণ।

অতিরিক্ত ডিউটির কারণে কনস্টেবল কাওসার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ডিউটির কারণে কোনো সমস্যা তৈরি হয়নি। এখন কোথাও ডিউটির অতিরিক্ত চাপ নেই। স্বাভাবিকভাবেই ডিউটি করছেন সবাই। আশা করাছি জিজ্ঞাসাবদে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

শনিবার দিবাগত মধ্যরাতে বারিধারা কূটনৈতিক এলাকার ফিলিস্তিন দূতাবাসের সামনে দায়িত্ব পালন অবস্থায় এক পুলিশ কনস্টেবল আর একজন সদস্যকে গুলি করেন। এতে ঘটনাস্থলেই মনিরুল হক নামে এক কনস্টেবল নিহত হন। ঘটনার পর অভিযুক্ত কাওসার আলীকে গ্রেপ্তার করে গুলশান থানা পুলিশ।