অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই

বাংলা একাডেমির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মারা গেছেন। 

রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়েছেন তার মেয়ে অধ্যাপক শুচিতা শরমিন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দুপুরে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক রাজধানীর মিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়েছিলেন। সেখানে আচমকা তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বেলা আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে তার মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসকেরা জানান।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। শিক্ষা ও মননশীল সাহিত্যে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তিনি ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার তাকে তিন বছরের জন্য বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করছিলেন।

সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার আন্দোলনে তিনি আজীবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’ নামে দুটি উচ্চমানের সাময়িকপত্র সম্পাদনার পাশাপাশি সমাজ, রাজনীতি ও সাহিত্য নিয়ে তার ২০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়েছে।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ:

  • মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২)
  • কালের যাত্রার ধ্বনি (১৯৭৩)
  • একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন (১৯৭৬)
  • উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণী ও বাংলা সাহিত্য (১৯৭৯)
  • মানুষ ও তার পরিবেশ (১৯৮৮)
  • রাজনীতি দর্শন, সাহিত্য চিন্তা, সংস্কৃতির সহজ কথা
  • সাহিত্যজিজ্ঞাসা: সাহিত্যসৃষ্টি ও সাহিত্যবিচার
  • জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্বায়ন ও ভবিষ্যৎ
  • বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও উত্তরকাল
  • আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা
  • বার্ট্রান্ড রাসেলের রাজনৈতিক আদর্শ (অনুবাদ)

এছাড়া তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘মোতাহের হোসেন চৌধুরীর নির্বাচিত প্রবন্ধ’, ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ‘স্বদেশচিন্তা’র মতো আকর গ্রন্থ।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের স্ত্রী ফরিদা প্রধান। এই দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ে শুচিতা শরমিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার একমাত্র ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন ছিলেন দেশের অন্যতম প্রগতিশীল প্রকাশনা সংস্থা ‘জাগৃতি প্রকাশনী’র স্বত্বাধিকারী। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর আজিজ সুপার মার্কেটে নিজস্ব কার্যালয়ে উগ্রবাদী দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন দীপন। ছেলের এই হত্যাকাণ্ডের পর অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ‘আমি বিচার চাই না’ সম্বলিত আকুল বক্তব্য তৎকালীন সময়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো।

গুণী এই শিক্ষাবিদ ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদের প্রয়াণে দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছে। তার জানাজা ও দাফনের বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে জানানো হবে।