তামান্না আক্তার নূরার আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া, অতঃপর বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার স্বপ্ন এখন তার কাছে ধোঁয়াশা নয়, বরং সময়ের সিঁড়ি বয়ে চলার পথে একরাশ চ্যালেঞ্জ তার সামনে।
বঙ্গবন্ধুর দুই তনয়ার হাত ধরে সেই চ্যালেঞ্জ লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে বলে দৃঢ়ভাবে প্রত্যয়ী অজেয় তামান্না। বললেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা দু’জনই বলেছেন আমার স্বপ্ন পূরণে পাশে থাকবেন। তাদের ফোন পেয়ে তো আমিই কেঁদেই ফেলেছিলাম।’
একপায়ে যুদ্ধ জয় করে চলা তামান্না আক্তার নূরা এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেয়েছেন। প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে পায়ে লিখে এর আগে পিইসি, জেএসসি ও এসএসসিতেও তামান্না একই ফলাফলের ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন।
তামান্নার স্বপ্ন এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিসিএস ক্যাডার ও গবেষক হওয়া। স্বপ্ন পূরণ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন তামান্না ও তার পরিবার। তবে প্রধানমন্ত্রী তামান্নাকে ফোন করে সাহস জোগানোর পর চেহারায় ফুটেছে হাসি।
অদম্য মেধাবী তামান্নার বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামে। তামান্নার এক পা-ই সম্বল। জন্ম থেকেই তার দুটি হাত ও একটি পা নেই। জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার লক্ষ্যে নানা প্রতিবন্ধকতা জয় করে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করে চলেছেন তিনি। তার বাবার নাম রওশন আলী। পেশায় ননএমপিও শিক্ষক।
তামান্না এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাই গ্রাম ছেড়ে রয়েছেন শহরের ভাড়া বাড়িতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাধর্মী কোনো বিষয়ে পড়াশোনা করে বিসিএস ক্যাডার হতে চান। পাশাপাশি দেশ ও মানুষের কল্যাণে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করতে আগ্রহী তিনি। যদিও পরিবারের আর্থিক অনটনে সেই স্বপ্ন কিভাবে পূরণ হবে জানতেন না তামান্না। স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠিও লিখেছিলেন তিনি।
এরপর সোমবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে প্রধানমন্ত্রী নিজেই ফোন করেন তামান্নাকে। এর আগে বিকেলে লন্ডন থেকে ফোন করেন শেখ রেহানা। দু’বোনই আশ্বাস দেন তামান্নার পাশে থাকার।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মেয়ের ভালো ফলাফলের খবর পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়েন তামান্নার মা খাদিজা পারভীন শিল্পী।
তামান্নার বাবা রওশন আলী বলেন, ‘গত ২৪ জানুয়ারি যশোরের জেলা প্রশাসকের পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর চিঠি লেখে তামান্না। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করাসহ দুটি স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন তামান্না। সেই চিঠির প্রেক্ষিতে সোমবার বিকেল ও সন্ধ্যায় পৃথক দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে অডিওকলে ফোন দিয়ে তামান্নাকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহেনা। একইসাথে তারা দুই বোনই তামান্নার স্বপ্ন পূরণে যেকোনো সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তামান্নার লেখা চিঠি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তামান্নার আঁকা বিভিন্ন ছবিও দেওয়া হয় ঐ চিঠির সাথে।’
আরও পড়ুন: হাত ছাড়া জন্মেও থামতে শেখেননি হেলাল
তামান্নার বাবা রওশন আলী আরো বলেন, ‘পরম করুণাময় আল্লাহর অসীম দয়ায় তামান্নার সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহেনা কথা বলেছেন। সবার দোয়ায় তামান্নার স্বপ্ন পূরণ হবে আশা করি।’
তামান্নার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কোচিংয়ের দায়িত্ব নেয় ইউনিভার্সিটি কোচিং সেন্টার (ইউসিসি) চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড যশোর শাখা। আর জেলা প্রশাসন তমিজুল ইসলাম খান বলছেন, তামান্নার স্বপ্ন পূরণে পাশে থাকবেন তারা।
ছোটবেলা থেকেই তামান্নার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি উপলব্ধি করে এখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে গবেষক হতে চান।
তামান্না ২০১৯ সালে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া আলী খান মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার বাবা রওশন আলী ঝিকরগাছা উপজেলার ছোট পৌদাউলিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার (ননএমপিও) শিক্ষক। মা খাদিজা পারভীন গৃহিণী।
তিন ভাইবোনের মধ্যে তামান্না সবার বড়। ছোট বোন মুমতাহিনা রশ্মি ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ভাই মুহিবুল্লা তাজ প্রথম শ্রেণির ছাত্র।
একাত্তর/আরএ