নারী সঙ্গীর জন্যই অস্থির হয়ে পড়েছিলো সেই হাতিটি

দীর্ঘ দিন থেকে একা ছিলো লালমনিরহাট শহরে দুই দিন ধরে তাণ্ডব চালানো সার্কাসের সেই হাতিটি। এনিয়ে মন খারাপ হতে হতে এক পর্যায়ে অসহ্য হয়ে ওঠে বিশালকার এই প্রাণীর জীবন। শেষ পর্যন্ত নারী সঙ্গী অভাবে অস্থির হয়ে শেকল ভেঙে বেরিয়ে পরে হাতিটি।

শেষ পর্যন্ত পুনাক মেলার সার্কাসের প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে পরার ২৪ ঘণ্টা পর চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে সেই পুরুষ হাতিতে বাগে এনেছে প্রাণী বিশেষজ্ঞ একটি দল। আবার চেতনা ফিরিয়ে আনা হলে হাতিটির পুরোপুরি সেরে উঠতে আরো কিছু দিন সময় লাগবে।

ঘটনার সূত্রপাত সোমবার দুপুরে। এ সময় মেলার একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা একটি হাতি হঠাৎ করে পায়ের শেকল ছিঁড়ে ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। হাতিটিকে লালমনিরহাটে পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) আয়োজিত শিল্প মেলার জন্য নিয়ে আসে দ্য লায়ন সার্কাস।

হাতি শিকল ছিঁড়ে শহরের সোহরাওয়ার্দী খেলার মাঠ থেকে রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত তাণ্ডব চালায়। এ সময় হাতিটি রাস্তার পাশের বেশ কয়েকটি গাছ, তিনটি দোকান, বিদ্যুতের খুঁটি ও কয়েকটি সীমানা পিলার ভেঙে ফেলে। রেললাইনে পাশে সিমেন্টের সীমানা খুঁটিও ভেঙ্গে ফেলে হাতিটি।


এসব তাণ্ডব চালিয়ে শহরের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে এক পর্যায়ে হাতিটি রেলওয়ে লাইনের পাশের জমিতে একটি পুকুরে নেমে পরে। সেখানে দীর্ঘ সময় পরে ছিলো হাতিটি। এক পর্যায়ে সেটি পুকুর থেকে উঠে গিয়ে পরে আশ্রয় নেয় শহরের বঙ্গবন্ধু কলোনির একটি বাঁশঝাড়ে।

মেলার পাশেই পান দোকানদার রহিম মিয়া বলেন, আমি দোকান করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ হাতিটি শিকল ছিঁড়ে তেড়ে আসে এবং আমার দোকানটি দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে দেয়। এতে আমার দোকানের যাবতীয় মালামাল নষ্ট হয়ে যায়।

স্টোরপাড়া এলাকার নবিয়ার রুহান জানান, হাতিটি শিকল ছিঁড়ে ফেলার পর আশপাশের গাছপালা সব উপড়ে ফেলে। এ সময় রেলওয়ের প্রাচীর ওয়ালের স্তম্ভ ভেঙে ফেলে। হাতিটি রেলওয়ে স্টেশন হয়ে এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে একটি পুকুরে নেমে শান্ত হয়। 

পুনাক মেলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে সার্কাসের নির্ধারিত এলাকা ভেঙে বের হয়ে যায় পুরুষ হাতিটি। তবে, হাতির মাহুত মজিবর বলেন, হাতিটি পুরুষ হওয়ায় নারী সঙ্গীর খোঁজে এমন বেপরোয়া হয়ে গেছে। আমরা হাতিটিকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি।

এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার সকালে ঢাকায় খবর দিলে হেলিকপ্টারযোগে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ডক্টর তপন কুমার দের নেতৃত্বে একটি টিম লালমনিরহাটে বেলা ১১টায় আসেন। এ সময় একটি বাঁশ বাগানে নিয়ে হাতিটিকে ট্র্যাঙ্কুলাইজার যন্ত্রের মাধ্যমে অচেতন করা হয়।

বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের সার্জন তপন কুমার দে বলেন, দুপুরে হাতিটিকে ট্রাঙ্কুলাইজার গান দিয়ে অচেতন করা হয়েছে। ওষুধ প্রয়োগের পর হাতিটি দৌড়ে বাঁশ বাগানে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে হাতি অচেতন আছে। হাতিটি প্রায় এক সপ্তাহ অচেতন থাকবে।

তিনি আরো বলেন, মাদা হাতিটি মাদি হাতির জন্য সমস্যা দেখা দিয়েছিল। আপাতত ওষুধ দিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণে এনেছি। সময় মতো মাদি হাতির সঙ্গ পেলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। এখন আর আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

হাতিকে শান্ত করতে সব মিলিয়ে খরচ পড়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। এমন তথ্য দিয়ে হাতির মালিক নিরঞ্জন সরকার বলেন, তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা সব মিলিয়ে খরচ হবে। তবু তো একটি প্রাণীর জীবন রক্ষা করা গেছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেয়াতেই খরচ বেড়েছে।


তিনি আরো জানান, গত ২২ বছর ধরে হাতিটি লায়ন সার্কাসের সাথে যুক্ত আছে। ওর বয়স ২৮ বছর। বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের কর্মী সুমন কুমার বাড়ই জানান, জ্ঞান ফেরার পর যদি এমন করে তবে হাতিটিকে ট্রাক কিংবা অন্য কোনোভাবে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে নিয়ে যাওয়া হবে।

আরও পড়ুন: নারী সঙ্গী না পেয়ে পুকুরে নেমে শান্ত হচ্ছে সার্কাসের হাতি

লালমনিরহাট সদর থানার ওসি শাহ আলম বলেন, স্থানীয় লোকজনের জানমালের ক্ষয়ক্ষতির কথা বিবেচনা করে মালিক পক্ষ বন বিভাগের লোকজনসহ হেলিকপ্টারে দ্রুত এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। 

এদিকে, লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক আবু জাফর জানিয়েছেন, সার্কাসের হাতিটি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে শহরের অনেক ক্ষতি করেছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা আবেদন করলে তদন্ত করে অনুদান দেয়া হবে।