শেষ ঠিকানায় ‘কবরের কারিগর’ মনু মিয়া

‘কবরের কারিগর’ গোরখোদক মনু মিয়া মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। ‎শনিবার (২৮ জুন) সকাল ১০টার দিকে কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি আলগাপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। 

শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে মনু মিয়া গত (১৪ মে) ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছিলেন।

‎স্থানীয়রা জানান, একজন সুদক্ষ গোরখোদক হিসেবে মনু মিয়ার সুনাম রয়েছে দুর্গম হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, শাল্লা, আজমিরীগঞ্জসহ পাশের এলাকায়। এছাড়া রাজধানীর বনানী কবরস্থানসহ দেশের নানা প্রান্তে তার সুনাম রয়েছে। শুধু কবর খনন করেই ক্ষান্ত হন না মনু মিয়া। এ পর্যন্ত যাদের কবর খুঁড়েছেন তিনি, তাদের মৃত্যুর দিন–তারিখ সব লিখে রাখেন নিজের ডায়েরিতে। সেই হিসাবে এ পর্যন্ত তিনি কবর খুঁড়েছেন তিন হাজার ৫৭টি। 

‎জয়সিদ্ধি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান বাহাউদ্দিন ঠাকুর জানান, ঘোড়ার মৃত্যুর পর থেকেই মনু মিয়া শারীরিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়েন। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে এলেও তার শারীরিক অবস্থা আগের মতো ছিলো না। তার মৃত্যুতে আমরা একজন দয়ার সাগর, নিঃস্বার্থ মানুষকে হারালাম। 

‎‎কারও মৃত্যুর সংবাদ কানে এলেই খুন্তি, কোদাল, ছুরি, করাত, দা, ছেনিসহ বিভিন্ন সহায়ক যন্ত্রপাতি নিয়ে কবরস্থানে ছুটে যেতে মনু মিয়া। 

‎পরম যত্ন আর অপার ভালোবাসা দিয়ে তৈরি করতেন মুসলিম সম্প্রদায়ের শেষ আশ্রয়স্থল ‘কবর’। মানুষের শেষ বিদায়ের একান্ত সঙ্গী হয়ে সাদা কাপড় পরানো থেকে শুরু করে আতর-গোলাপ মাখিয়ে পাশে থাকেন কবরে মাটি দেওয়া অবধি। হাওর অধ্যুষিত কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় শেষ বিদায়ের এই পরম সঙ্গীর নাম এই ছিলো গোরখোদক মনু মিয়া। গোর খুঁড়ে তিনি পার করে দিয়েছেন তার ৬৭ বছরের জীবনের সুদীর্ঘ ৪৯টি বছর। কোনো ধরনের পারিশ্রমিক কিংবা বখশিশ না নিয়ে এ পর্যন্ত খনন করেছেন তিন হাজার ৫৭টি কবর।

দুই ভাই ও তিন বোনের সংসারে মনু মিয়া ছিলেন তৃতীয়। কবর খোঁড়ার কাজে বাহন হিসেবে এ পর্যন্ত তিনি চৌদ্দটি ঘোড়াও কিনেছেন। আর এ জন্য বিক্রি করতে হয়েছে তার পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি। পৈত্রিক অন্য সম্পত্তি বন্ধক দিয়েই চলছিল নিঃসন্তান মনু মিয়ার সংসার ও কবর খোঁড়ার কাজ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে কবর খোঁড়ার কাজ করতে হাওরের বন্ধুর পথে ঘোড়ায় চড়ে পৌঁছে যেতেন তিনি। কবর খোঁড়ার সেই নিখুঁত কারিগর আজ তার নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

গত ১৬ মে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হাশেমপুর ছত্রিশ গ্রামের একটি মাদ্রাসার পাশে তার ঘোড়াটিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। শরীরে ছিল আঘাতের চিহ্ন। স্থানীয়দের ধারণা, ইচ্ছে করেই ঘোড়াটি মেরে ফেলা হয়েছে।