সিলেট অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। চার জেলায় পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। পানি না নামায় মানবেতর দিন কাটছে তাদের। চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে সিলেট বিভাগের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ৮ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করেছে শিক্ষাবোর্ড।
বৃষ্টি ও উজানের ঢলে দ্বিতীয় দফার বন্যায় সিলেট জেলায়ই পানিবন্দি সাড়ে নয় লাখ মানুষ। অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। পানিবন্দিদের উদ্ধারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ।
বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে সিলেটের গোয়াইনঘাটের ১৩ টি ইউনিয়ন। দুর্ভোগে রয়েছে পানিবন্দি মানুষ । অনেকে গরু-বাছুর নিয়ে ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে।
এদিকে, আকস্মিক এ বন্যায় জানমালের ক্ষতি কমাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ।
গোয়াইনঘাট উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তৌহিদুল ইসলাম জানালেন, দুর্গত এলাকার মানুষদের রান্না করা খাবারের পাশাপাশি শুকনো খাবার দিচ্ছে প্রশাসন।
একইভাবে বন্যায় তলিয়ে আছে সিলেটের বিয়ানিবাজার উপজেলার ১১ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৯০ টি গ্রাম। এখানকার আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া মানুষগুলোর অভিযোগ খাবার না পাবার।
যদিও বিয়ানিবাজার উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী শামিম বলছেন, বিয়ানিবাজারের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিতরণ করা হয়েছে ত্রাণ। পুরো উপজেলায় খোলা হয়েছে ৬৭টি আশ্রয় কেন্দ্র।
আর ওসমানিনগর, বালাগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলায় বন্যা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। সেখানেও পানিবন্দি মানুষগুলো দিন কাটছে খেয়ে না খেয়ে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী জানান, তার প্রায় পুরো নির্বাচনী এলাকার মানুষ বন্যা কবলিত। তবে, তার এলাকার কোনো মানুষ না খেয়ে বা বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন না বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, প্রতিটি নদীর পানি এখনো বইছে বিপদসীমার ওপরে। পুরো জেলায় এখন পর্যন্ত প্লাবিত এক হাজার ৫৪৮ টি গ্রাম।
হবিগঞ্জের কয়েক জায়গায় নদীর পানি কিছুটা কমলেও এখনও তা বইছে বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে। হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করেছে লোকালয়ে। আর একটানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর অব্যাহত বৃষ্টির ফলে হবিগঞ্জের নদনদীর পানিতে তলিয়ে গেছে শহরতলীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা।
এছাড়া কুলাউড়ার বুধবার পর্যন্ত প্লাবিত হয়েছে ৬০টি গ্রাম। ২২টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে সেখানে। গঠন করা হয়েছে ১৪টি মেডিকেল টিম। জেলাজুড়ে বন্যা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে আট লাখ।
বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বেড়ে সুনামগঞ্জে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি। সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমলেও এখানে এক হাজার ১৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এখানকার ৭৮টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভার ৬ লাখ ৬৮ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দি। আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ৫৪১টি।
বন্যার পানিতে ভেসে গেছে রাস্তাঘাট-ঘরবাড়ি। দুর্ভোগে আছেন সুনামগঞ্জবাসী। মানুষের সাথে সাথে কষ্টে আছে অন্যান্য প্রাণীও।
মৌলভীবাজারেও পানি বেড়ে সাত উপজেলার প্রায় ৩৫ টি ইউনিয়নের নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি জেলার প্রায় দুই লাখ মানুষ।
নেত্রকোণার সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দার উব্দাখালি নদীর পানিও বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। পানিতে তলিয়ে গেছে এ উপজেলার নিচু এলাকার অনেক সড়ক ।
নেত্রকোণা জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সারওয়ার জাহান জানান, জেলার সব নদীর পানিই বাড়ছে।
এদিকে, কুড়িগ্রামেও ১৬টি নদনদীর পানি বাড়ছে। তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া রেলসেতু পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে।