সুরসম্রাজ্ঞী হয়েও আড়ালেই থাকতেন লতা মঙ্গেশকর

প্রয়াত কিংবদন্তী অভিনেতা দীলিপ কুমার একবার সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর সম্পর্কে বলতে গিয়ে একটি শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন। সেই শব্দ হলো ‘পারিন্দা’, মানে পাখি।

শুধু দীলিপ কুমার নয়, লতার লাখো-কোটি ভক্তরাও মনে করেন, তিনি এমন এক উচ্চতার শিল্পী যেখানে তার তুলনা তিনিই। লতা মঙ্গেশকর একজনই হয়।

তিনি এসেছিলেন এক সংস্কৃত পরিবার থেকে। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন তার সময়ের একজন পরিচিত মারাঠি নাট্য অভিনেতা ও গায়ক।

১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এই মারাঠি পরিবারেই লতা জন্মগ্রহণ করেন। বাবা দীননাথ আদর করে মেয়েকে ডাকতেন লক্ষ্মী। উনি বুঝতে পেরেছিলেন তার মেয়ে এক জাত শিল্পী।

লতাকে প্রথম হেমা বলেই ডাকতেন দীননাথ। নিজের ‘ভাব বন্ধন’ নাটকের ‘লতিকা’র চরিত্রে প্রভাবিত হয়ে হেমার নাম বদল করে লতা রেখে দেন তিনি।

বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের কাছেই সংগীতে হাতেখড়ি। তবে বেশিদিন বাবার স্নেহ পাননি লতা। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই বাবাকে হারান।


জীবনে প্রথম বাবার সঙ্গেই মঞ্চে উঠেছিলেন লতা, তখন বয়স মাত্র ৯। সেই দিনের ঘটনাকে মনে করে তিনি বলতেন, ‘বহুত তকলিফ উঠায়ি হ্যয় ম্যয়নে’।

পরে বাবাকে হারিয়ে জীবনযুদ্ধে নেমেও অভিনয় করতে হয়েছিলো তাকে। অর্থের তাগিদেই ছবিতে অভিনয় করতে হলেও, কখনই কোন আগ্রহ ছিলো না এই জগতের প্রতি।

সংগীতই ছিলো তার সঙ্গী। এমনকি স্কুলের প্রথম দিনে বাচ্চাদের গান শেখাতে গিয়েও বকাও খেয়েছিলেন লতা। অভিমানে পরের দিন থেকে স্কুল যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি।

দীননাথের মৃত্যুর পর বন্ধ হয়ে যায় তার নাট্যদল। তখন লতার কাঁধে আশা, ঊষা, মিনা আর হৃদয়নাথ আর মাসহ পরিবারের দায়িত্ব। তারা চলে আসেন পুণেতে।

শুরু হলো লতার জীবন লড়াই। কাজের মধ্যে মনপ্রাণ ঢেলে দেন। সাহায্য পেলেন বিনায়ক দামোদর কর্নাটকির, যিনি ছিলেন ‘নবযুগ চিত্রপট’ ফিল্ম কোম্পানির মালিক।

১৯৪২ সালে মারাঠি ছবি ‘কিতী হসাল’-এ প্রথম গান রেকর্ড করেন লতা। ১৯৪৫ সালে নবযুগ চিত্রপট মুম্বই পাড়ি দিলে, পিছু নেন লতা মঙ্গেশকর।


তৎকালীন বম্বেতে মঞ্চে গাইতেন লতা। তার প্রথম উপার্জন ছিলো ২৫ টাকা। প্রথমবার মঞ্চে গাওয়ার জন্য লতা ওই ২৫ টাকা পান।

সেই সময়ে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত শিখতে উস্তাদ আমন আলি খানের কাছ থেকে তামিল নিতে শুরু করেন লতা মঙ্গেশকর।

বিনায়ক দামোদর মারা যাওয়ার পর লতার সঙ্গে পরিচয় হয় সঙ্গীতজ্ঞ গুলাম হায়দারের সঙ্গে। পরে এক সাক্ষাৎকারে তাকে ‘গডফাদার’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন লতা।

গুলাম হায়দার সাহেব একদিন ছোট্ট লতাকে নিয়ে গিয়েছিলেন তখনকার বিখ্যাত প্রযোজক শশধর মুখোপাধ্যায়ের কাছে। কিন্তু শুরুতেই তার পছন্দ হয়নি লতার কণ্ঠ।

শশধর লতার গলার স্বর শুনে বলেছিলেন, ‘বড্ড সরু গলা’। মনে হয়েছিল, মেয়েটির গলা তেমন নয়। বিরক্ত হায়দার সেদিন বলেছিলেন, একদিন এই কণ্ঠের জন্যই প্রযোজকদের লাইন পড়বে।

তার সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ছবি মজবুর-এ তিনি লতাকে দিয়ে গাওয়ালেন গান– দিল মেরা তোটা, মুঝে কহিঁ কা না ছোড়া। বাজিমাত হল সেই গানে।

এরপর আরো সুযোগের সাথে এসেছিলো সমালোচনাও। তবে দমে যাননি লতা। কারণ তিনি জানতেন সমালোচনা তখনই হয় যখন তার গান সবাই শুনতে শুরু করেছে।


এমনকি সেই সময়ের টপ হিরো দীলিপ কুমারও লতার উর্দু বচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এটা শুনে লতা সঙ্গে সঙ্গে উর্দুও শিখে ফেলেন।

অবশেষে ১৯৪৯ সালে হিট হয় ‘আয়েগা আনেওয়ালা। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি লতা মঙ্গেশকরকে। হায়দার সাব শুধু রত্ন চিনেছিলেন তা নয়, চিনেছিলেন কোহিনূর।

এরপর অনিল বিশ্বাস থেকে শচীন দেববর্মণ, খৈয়াম, নওশাদ, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখার্জি, কল্যাণ-আনন্দ, রামচন্দ্রমের মতো গুণী পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন লতা।

আর, ষাটের দশকে লক্ষ্মীকান্ত প্যায়ারেলালের সঙ্গে ৩৫ বছর ধরে ৭০০ গান রেকর্ড করেন লতা। শোনা যায় সেসময় লতাকে বিষ দিয়ে মারার চেষ্টাও হয়েছিল। তিন মাস অসুস্থ ছিলেন তিনি।

৯০ দশকে সিনেমার ক্যানভাস বদলে গেলেও লতা রইলেন স্বমহিমায়। নাদিম-শ্রাবণ থেকে শুরু করে এ আর রহমান, তারও আগে আর ডি বর্মণ- কেউ লতাকে বাদ দেয়ার স্পর্ধা দেখায়নি।

শুধু হিন্দি নয়, আরও ৩৫টা ভাষায় কমপক্ষে হাজার খানেক গান রেকর্ড করেছেন লতা। সব মিলিয়ে লতার গানের সংখ্যা সাত হাজার, অনেকে বলেন দশ হাজারের বেশি।

বাংলার দুই প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক সলিল চৌধুরী ও মান্না দে ছিলেন লতার পারিবারিক বন্ধু। আর কিশোর কুমার ও হেমন্ত মুখার্জি ছিলেন তার রাখি ভাই।

অনেকে জানে না, ছদ্মনামে গান পরিচালনাও করেছেন লতা। ‘আনন্দ ঘন’ নামে গান পরিচালনা করতে গিয়ে একবার পুরস্কার জিতে যান লতা। এতেই বেরিয়ে আসে তার সেই পরিচয়।

ভারতের সর্বকালের সেরা সংগীত শিল্পী আর ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত একমাত্র মানুষ হয়েও লতা ছিলেন মাটির কাছে। নিজেকে আড়াল করে রাখতেন। অভ্যস্ত ছিলেন সাদামাটা জীবনে।

মুম্বইয়ের পেডার রোডের বাড়িতে একেবারেই নিভৃতচারী ছিলেন লতা। মাটি থেকে উঠে আসা আর মাটির সঙ্গে লেগে থাকা তারারাই সত্যিকারের শিল্পী বলে মনে করতেন তিনি।

এমন এক লতা মঙ্গেশকরের কাছে তাই ঋণী বিশ্বে সংগীতের সব জাতি। তিনিই পেরেছেন শিল্পকলার সব মাধ্যমকে নিজের সুরে জাগিয়ে তুলতে। তাই মরেও অমর লতা মঙ্গেশকর।


একাত্তর/টিএ