২০০২ সালের বলিউডের জনপ্রিয় ‘কাঁটা লাগা’ মিউজিক ভিডিও দিয়ে ঘরে ঘরে পরিচিতি পাওয়া অভিনেত্রী ও মডেল শেফালি জারিওয়ালা ২৭ জুন শুক্রবার মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৪২ বছর। তার মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের রহস্য। নেট দুনিয়ায় চলছে তুমুল চর্চা।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এখনও প্রকাশিত না হলেও, প্রাথমিক পুলিশি তদন্ত এবং মেডিকেল পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, শেফালি জরিওয়ালার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সম্ভবত উপবাস এবং ওজন কমানোর ও বাধ্যর্করোধী ওষুধের সংমিশ্রণের কারণে ঘটেছে।
পুলিশ সূত্র এবং মেডিকেল কর্মকর্তাদের দ্বারা নিশ্চিত হওয়া ঘটনাগুলোর একটি বিস্তারিত সময়রেখা এখানে দেয়া হলো:
২৭ জুন: মুম্বাইয়ে তার বাড়িতে অনুষ্ঠিত সত্যনারায়ণ পূজার অংশ হিসেবে শেফালি জারিওয়ালা দিনব্যাপী উপবাস পালন করেন। উপবাস থাকা সত্ত্বেও, শেফালি তার নিয়মিত বার্ধক্যবিরোধী ওষুধ সেবন করেন এবং গ্লুটাথিয়ন ইনজেকশনের একটি শিশিও দেন।
পুলিশের মতে, ত্বকের তারুণ্য বজায় রাখার জন্য তিনি মাল্টিভিটামিন এবং কোলাজেন সাপ্লিমেন্টও গ্রহণ করছিলেন। সেদিন রাত ১০.৩০ মিনিটের দিকে শেফালি তার বাড়িতে ভেঙে পড়েন। রাত ১১.১৫ মিনিটে তাকে দ্রুত আন্ধেরি পশ্চিমের বেলভিউ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানের চিকিৎকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন এবং পরিবারকে ময়নাতদন্তের জন্য তার দেহ কুপার হাসপাতালে স্থানান্তর করার পরামর্শ দেন। এরপর শুক্রবার রাত ১১.১৫ মিনিটের দিকে তাকে সেই হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানের চিকিৎকরাও শেফালিকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাত ১১.৩০ মিনিটের দিকে আম্বোলি থানায় ঘটনাটি জানানো হয়। আর রাত ১১.৪৫ নাগাদ একটি পুলিশ দল শেফালির বাসভবন এবং কুপার হাসপাতালে পৌঁছে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে।
শেফালির ঘনিষ্ঠ বন্ধু পূজা ঘাই অভিনেত্রীর শেষ মুহূর্তগুলো স্মরণ করে বলেন, যে মুহূর্তে শেফালি পড়ে যায়, তখন নিতে নিচে ছিলেন। তাকে ফোন করে বাড়ির গৃহকর্মী বলেছিলেন, দিদির শরীর ভালো লাগছে না। তিনি পূজাকে অনুরোধ উপরে এসে শেফালির যত্ন নেয়ার অনুরোধ করেন।
২৮ জুন: কুপার হাসপাতালে একটি সরকারি মেডিকেল টিম ময়নাতদন্ত করে। প্রোটোকল অনুসারে, পুরো প্রক্রিয়াটি ভিডিও রেকর্ড করা হয়ে। পাঁচজন ডাক্তারের একটি দল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে।
মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণে সহায়তা করার জন্য ভিসেরা সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং মুম্বাইয়ের কালিনার ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে।
চিকিৎসা ও তদন্ত যা জানা গেলো
মুম্বাই পুলিশ সন্দেহ করছে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ এবং খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে হৃদরোগের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা শেফালি জারিওয়ালার মৃত্যুতে ভূমিকা রেখেছে। পুলিশের মতে, অভিনেত্রী উপবাসের সময় বাসি ফ্রাইড রাইস খেয়েছিলেন এবং বার্ধক্য বিরোধী ইনজেকশনও নিয়েছিলেন।
পুলিশ এবং ফরেনসিক বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা, যারা তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছিলেন তারা ত্বককে ফর্সা রাখা গ্লুটাথিয়নের শিশি এবং শরীরের বিষমুক্তকরণের জন্য ব্যবহৃত ভিটামিন সি ইনজেকশন, অ্যাসিডিটি বড়ি এবং অন্যান্য ওভার-দ্য-কাউন্টার অ্যান্টি-এজিং সাপ্লিমেন্টের সাথে পেয়েছিলেন।
গ্লুটাথিয়ন ত্বক উজ্জ্বল এবং বিষমুক্তকরণ এজেন্ট হিসাবে বাজারজাত করা হয়। এটি প্রাকৃতিকভাবে শরীর উৎপাদিত হয়। তবে, তারুণ্যের ত্বকের প্রতি উন্মাদনা অনেকেই উচ্চ-মাত্রার শরীরের শিরায় গ্লুটাথিয়ন ইনফিউশন বেছে নিতে বাধ্য করছে, সঠিক চিকিৎসা তত্ত্বাবধান ছাড়াই এ ধরনের ইনজেনশন নেয়া হচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশেষ করে উপবাসের সময় এ ধরনের ওষুধ ও ইনজেকশন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং হৃদরোগের মতো গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। অথচ শেফালি জরিওয়ালা গত সাত থেকে আট বছর ধরে নিয়মিত বার্ধক্য বিরোধী ওষুধ সেবন করছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার এক ডাক্তার নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি শেষবার মার্চ মাসে, মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আগে তাদের ক্লিনিকে গিয়েছিলেন। প্রাথমিক চিকিৎসার ফলাফলে দেখা গেছে যে তার মৃত্যু রক্তচাপের তীব্র হ্রাসের কারণে হতে পারে, যার ফলে সম্ভবত হৃদরোগের ঘটনা ঘটে।
প্রাথমিক চিকিৎসা পরীক্ষার ফলাফল অনুসারে, শেফালির মৃত্যু নিম্ন রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং ভারী গ্যাস্ট্রিকের অবস্থার কারণে হয়েছে বলে জানা গেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে, তবে ভিসেরা পরীক্ষার ফলাফল আসতে ৫০ থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
আম্বোলি থানায় দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হিসেবে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। শেফালির স্বামী পরাগ ত্যাগী, পরিবারের সদস্য, গৃহকর্মী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোনও অনিয়মের সন্দেহের খবর পাওয়া যায়নি।
শেফালি জারিওয়ালার শেষকৃত্য
শেফালি জারিওয়ালার শেষকৃত্য ২৮ জুন মুম্বাইয়ের ওশিওয়ারা শ্মশানে অনুষ্ঠিত হয়। তার বাবা, ভাই ও স্বামী হিন্দু রীতি অনুসারে শেষকৃত্য শেষ করেন। শেফালির স্বামী পরাগ ত্যাগী তার শেষকৃত্য শেষ করার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব এবং বেশ কয়েকজন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হন। টিভি অভিনেতা আরতি সিং, মাহিরা শর্মা এবং রশ্মি দেশাইকে তার বাড়িতে দেখা যায়, যেখানে তার মরদেহ দাহের জন্য নিয়ে যাওয়ার আগে রাখা হয়েছিলো।