কিয়েভ দখলের আগে আরো ভয়ংকর ও বেপরোয়া মস্কো

ন্যাটোর সদস্য পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে ইউক্রেনের বিশাল একটি সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ও ভয়ংকর মিসাইল হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে এখন পর্যন্ত ৩৫ জন নিহত ও ১৩৫ জন গুরুতর জখম হয়েছে বলে দাবি করেছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।

ইউক্রেইনের ওই সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি লিভিভ শহরের ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের জেলা ইয়াভোরিভে অবস্থিত। সেখানে রাশিয়া ৩০টি রকেট ছুড়েছে। ঘাঁটিটিতে ন্যাটো জোটের কোনো সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না।

ইয়াভোরিভের এই ঘাঁটিটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী ও নিরাপত্তা কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করা হতো। বিদেশি প্রশিক্ষকরা সেখানে কাজ করেন। হামলার সময় তাদের কেউ সেখানে ছিলেন কিনা এবং কেউ হতাহত হয়েছেন কিনা তা স্পষ্ট করে জানার চেষ্টা চলছে।

পোল্যান্ড সীমান্ত থেকে ২৫ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত ৩৬০ স্কয়ার কিলোমিটারের ওই সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি ইউক্রেইনের পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে বড় একটি স্থাপনা।

সেখানে রুশ হামলার পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সতর্ক করে বলেছেন, এতেই পরিষ্কার রাশিয়া হামলা বিস্তৃত করেছে। অন্যদিকে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলছেন, ন্যাটোর দিকে রাশিয়া হাত বাড়ালে উপযুক্ত জবাব দেয়া হবে।

বিপরীতে রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিন পশ্চিমাদের প্রতি আবারও হুশিয়ারি দিয়ে বলছেন, ইউক্রেনে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো বন্ধ না করা হলে বিকল্প ভাববে ক্রেমলিন। পশ্চিম থেকে আসা সামরিক সারঞ্জামবাহী পরিবহনগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

এর আগে শনিবার (১২ মার্চ) আমেরিকা ঘোষণা করে, তারা ইউক্রেনকে অতিরিক্ত ২০ কোটি ডলারের অস্ত্র ও সরঞ্জাম পাঠাবে। আর এটি হবে আগের পাঠানো ট্যাংক ও বিমানবিধ্বংসী রকেটের অতিরিক্ত। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওয়াশিংটনের প্রতি বার্তা পাঠিয়েছে মস্কো।

লিভিভের পাশাপাশি রোববার স্থানীয় সময় সকালে পশ্চিমের আরেক শহর ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্কেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানকার একটি বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে রুশ সেনারা।

ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে রাশিয়া এতদিন দেশটির উত্তর, দক্ষিণ আর পূর্ব সীমান্ত দিয়ে লাগাতার হামলা চালিয়েছে। এবার লিভিভ দিয়ে পশ্চিম সীমান্তেও হামলা শুরু হয়ে গেল। বিশ্লেষকদের ধারণা, কিয়েভ দখলের পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই এমনটা করছে মস্কো।

ইউক্রেনে সবচেয়ে ভয়াবহতার পরিস্থিতি এখন বন্দরনগরী মারিউপোলে। এই শহরে সংঘাতের পাশাপাশি চলছে লুটপাট। পানি, বিদ্যুৎ, খাবার সংকটে দিন কাটাচ্ছে স্থানীয়রা। শহরটি নিয়ন্ত্রণে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে রাশিয়ার সেনাবাহিনী।

মারিউপোলের নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রুশ হামলায় ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এই শহরে  এখন পর্যন্ত দুই হাজার ১৮৭ জন বেসামরিক বাসিন্দা মারা গেছেন। গেলো দুই সপ্তাহে শহরটিতে রাশিয়া ২২ বার স্থল ও আকাশপথে হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ অভিমুখে থাকা রাশিয়ার বিশাল সামরিক বহরটি আরও অগ্রসর হয়েছে। সেটি এখন কিয়েভ থেকে ২৫ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে রয়েছে। বহরটি খুব ধীর গতিতে এগুচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে কিয়েভ দখলে সবুজ সংকেত এখনও দেয়নি মস্কো।

আরও পড়ুন: ইউক্রেনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মার্কিন সাংবাদিকের মৃত্যু

উত্তর–পূর্ব এবং উত্তর পশ্চিম দিয়ে কিয়েভের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে রুশ সেনারা। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইলো পোডোলিয়াক জানিয়েছে, সেনা ও স্বেচ্ছাসেবীরা অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত। রাজধানীর সব রাস্তায় তারা পাহারা দেবেন। রুশ সেনাকে হঠিয়ে দেবেন।

ইউক্রেন দাবি করেছে, কিয়েভ থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়া নারী-শিশুদের একটি বড় দলের উপর হামলা চালিয়েছে রুশ সেনারা। কিয়েভের কাছে একটি গ্রামে সেই হামলায় সাতজন মারা গেছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে মস্কো কোন মন্তব্য করেনি।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রি কুলেবা জানিয়েছেন, মারিউপোল, খারকিভ, চেরনিহিভসহ একাধিক শহরের বোমাবর্ষণ করেছে রাশিয়া। খারসনে জনসমর্থন পেতে একটি গণভোট আয়োজন করার পরিকল্পনা করছে রাশিয়া।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছে, মানবিক করিডোর ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত এক লক্ষ ২৫ হাজার ইউক্রেনবাসীকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যেতে তারা সক্ষম হয়েছেন। তবে রুশ হামলায় এমন কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও নালিশ করেছেন তিনি।


একাত্তর/আরএ