যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন জো বাইডেন। বুধবার, সান ফ্রান্সিসকোতে জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে এ আহ্বান জানান তিনি। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে রাজি হয়েছেন বাইডেন-শি।
তারা এক বছরের মধ্যে প্রথম এই শীর্ষ বৈঠকে উত্তেজনা হ্রাসে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে রাজি হয়েছেন। তাইওয়ান ইস্যুতেও চীনা নেতার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি জানান, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান প্রণালীতে শান্তি ও স্থিতিশীলতার গুরুত্ব দিয়েছে।
এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও গাজা সংঘাত নিয়েও চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাইডেন। পাশাপাশি দুই দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আরও পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করার বিষয়ে তারা কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
দু’পক্ষই বলেছে, তারা মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একে অপরকে সাহায্য করবে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র অবৈধ ফেন্টানাইলের জোয়ার রোধ করার জন্য রাসায়নিক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এই উপাদানটি অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণের ফলে মানুষের মৃত্যু অনেক বেড়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দুই দেশের নেতারা এক বছরে তাদের প্রথম আলোচনার জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ঐতিহাসিক এস্টেটে মিলিত হওয়ার সাথে সাথে হাত মেলালেন এবং হাসলেন এবং বাগানে হাঁটার সাথে চার ঘণ্টার শীর্ষ বৈঠকটি শেষ করলেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার ফিলোলি এস্টেটে এক সংবাদ সম্মেলনে বাইডেন বলেন, আমি সবেমাত্র প্রেসিডেন্ট শি’র সঙ্গে কয়েক ঘণ্টার বৈঠক শেষ করেছি এবং আমি বিশ্বাস করি যে সেগুলো আমাদের মধ্যে সবচেয়ে গঠনমূলক এবং ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। শি বুধবার আলোচনার সময় স্বাভাবিক ছিলেন।
২০২২ সালে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফর করার পরে চীন সামরিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল। বাইডেন বলেন, এই বৈঠকে সেই যোগাযোগ পুনরুদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দু’পক্ষের ভুল ধারণা চীনের মতো একটি দেশের সাথে বাস্তব সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে শি এবং বাইডেন তাইওয়ানের প্রশ্নে ব্যাপক আলোচনা থেকে অনেক দূরে ছিলেন। চীনের প্রেসিডেন্ট তার মার্কিন সমকক্ষকে তাইওয়ানকে অস্ত্র দেয়া বন্ধ করতে বলেন এবং তাইওয়ানের পুনর্মিলন অপ্রতিরোধ্য বলে উল্লেখ করেছেন। বেইজিং, স্বশাসিত গণতন্ত্রের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে।
প্রতিনিধিদল নিয়ে বৈঠকে একটি দীর্ঘ কাঠের টেবিল জুড়ে বসা শি’কে উদ্দেশ্য করে বাইডেন বলেছেন, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে প্রতিযোগিতা যেন সংঘর্ষে না যায়। শি এর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দুই দেশের সফল হওয়ার জন্য এই গ্রহ যথেষ্ট বড়। তিনি বলেন, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুটি বড় দেশের জন্য একে অপরের দিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কোন বিকল্প নয়।
বাইডেন শিকে আরও বলেন, আমি আমাদের কথার মূল্য দেই। কারণ আমি মনে করি আমরা নেতা হিসেবে পরস্পরকে স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি, কোনো ভুল ধারণা বা ভুল বোঝাবুঝি ছাড়াই। চীনা নেতা এতে সম্মত হন। তিনি বলেন, সংঘাত ও সংঘর্ষ উভয়পক্ষের জন্যই অসহনীয় পরিণতি বয়ে আনে।
২০২২ সালের নভেম্বরে বালিতে আলোচনার পর থেকে এই দুই নেতা ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেননি এবং এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি কথিত চীনা গুপ্তচর বেলুনকে গুলি করে নামানোর পরে সম্পর্কে আরও টানাপোড়ন দেখা দেয়। এরপর থেকে বেইজিং ও ওয়াশিংটন দুই নেতাকে মুখোমুখি পেতে তীব্র কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়। সেই প্রচেষ্টাই অবশেষে আলোর মুখ দেখলো।
দু’দেশের চুক্তির বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট থাকলেও, এটি নিছক একটি বৈঠক ছিল। বাইডেন-শি করমর্দন করেছেন, একে একটি ইতিবাচক লক্ষণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দুই প্রেসিডেন্টের একে অপরের সাথে কথা বলতে পারাই এক ধরনের কূটনৈতিক অর্জন। যদি তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে সম্মত হতে পারে, তবে এটি একাই একটি সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।