পাঁচ দশক পরেও ভিয়েতনামের যুদ্ধের স্মৃতি তাড়া করে বেড়াচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে। আর সম্প্রতি সেখানেই ইসরাইলবিরোধী ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভে ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদের ভূত’ দেখছে কর্তৃপক্ষ।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলমান ইসরাইলি আগ্রাসন ও গণহত্যা বন্ধের দাবিতে মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যামিল্টন হল দখল করে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে শত শত শিক্ষার্থী। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করে ১৯৬৮ সালেও একইভাবে হলটি দখলে নিয়েছিল শিক্ষার্থীরা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিলো বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি। সেই সুযোগে ভিয়েতনামের ওপর দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভিয়েতনামের সামরিক বাহিনী এবং তাদের গেরিলা মিত্র ভিয়েত কং-এর কাছে পরাজিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এ পরাজয়ের পেছনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিলো মার্কিন সচেতন নাগরিক সমাজ ও যুদ্ধবিরোধী লাখো শিক্ষার্থী। যারা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে অস্বীকার করেছিল এবং ভিয়েতনামের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কলম্বিয়া ছিলো সবচেয়ে অগ্রসর।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি গণহত্যার বিরুদ্ধেও একইভাবে ফুঁসে উঠেছে মার্কিন শিক্ষার্থীরা। যার নেতৃত্বে সেই কলম্বিয়া। দখলদার ইসরাইলের অসম যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির বিভিন্ন ক্যাম্পাসে কমপক্ষে ৪০টি ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিবাদ শিবির স্থাপন করা হয়েছে। ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও লেগেছে সেই ঢেউ।
১৯৬৮ সালের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৬৮ সালের বিক্ষোভটি প্রধানত স্টুডেন্টস ফর এ ডেমোক্রেটিক সোসাইটি দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল, যা ১৯৬০ এর "নতুন বাম" আন্দোলন এবং কলম্বিয়ার সোসাইটি অফ আফ্রো-আমেরিকান স্টুডেন্টস গঠনের একটি প্রধান ভিত্তি ছিলো।
১৯৬৮ সালের এপ্রিলে বেশ কিছু ঘটনা এই গণ-বিক্ষোভকে উৎসাহিত করেছিল। যার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্নিংসাইড পার্কে একটি বিচ্ছিন্ন জিমনেসিয়াম তৈরির পরিকল্পনা ছিলো, যা হারলেমের সংখ্যাগরিষ্ঠ-কৃষ্ণাঙ্গ এলাকার সীমান্তবর্তী একটি বড় পাবলিক পার্ক।
সেসময় ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স অ্যানালাইসিসের (আইডিএ) সাথে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জানিয়েছিল শিক্ষার্থীরা। মূলত আইডিএ একটি মার্কিন প্রতিরক্ষা থিংক ট্যাঙ্ক বিভাগ, যা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সাথে ব্যাপকভাবে জড়িত ছিলো।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রেসন কার্কের অফিসসহ ক্যাম্পাসের মোট পাঁচটি বিল্ডিং দখল করে নিয়েছিল বিক্ষোভকারীরা। এমনকি ডিন হেনরি এস কোলম্যানকে প্রায় ২৪ ঘণ্টা আটক রেখেছিল শিক্ষার্থীরা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের সেই সময়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাসে মাত্র সাত দিনে ৭০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছিল নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি)। তবে একজন বিচারক একই বছরের অক্টোবরে কমপক্ষে ৩৬৮ জনকে অপরাধমূলক অনুপ্রবেশের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।
সংবাদমাধ্যমটির আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, সে সময় মোট ৭৩ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে বেশিরভাগকে পুনর্বহাল করা হলেও ৩০ জনকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিক্ষোভের প্রভাবে যা হয়েছিল
পুলিশ হ্যামিল্টন হল এবং ক্যাম্পাসের অন্যান্য ভবন থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিলে ১৯৬৮ সালের ৩০ এপ্রিল প্রাথমিক বিক্ষোভ শেষ হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অনেক লক্ষ্যই বাস্তবায়িত হয়।
যার মধ্যে ছিলো- মর্নিংসাইড পার্কে জিমনেসিয়াম তৈরির পরিকল্পনা বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাস থেকে ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স অ্যানালাইসিসকে (আইডিএ) প্রত্যাহার করা হয় এবং ক্যাম্পাসে অস্থায়ীভাবে সামরিক নিয়োগ নিষিদ্ধ করে কর্তৃপক্ষ।
ওই বিক্ষোভ শেষ হওয়ার পর এক সপ্তাহের জন্য ক্লাস বাতিল করা হয়েছিল, কিন্তু শিক্ষার্থীরা একটি "ছাত্র ধর্মঘট" পালন করেছিল এবং সেমিস্টারের বাকি সময় ক্লাস করা থেকে বিরত ছিলো।
৩০০ জনের বেশি স্নাতক শিক্ষার্থী সেই বছর আনুষ্ঠানিক সূচনা অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যায় এবং আগস্টে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রেসন কার্ক পদত্যাগ করেন।
আন্দোলনের একাল-সেকাল
গেলো মঙ্গলবার ডেইলি বিস্টকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন ছাত্রনেতা মার্ক রুড বলেন, ২০২৪ সালের বিক্ষোভকারীরা ১৯৬৮ সালের তুলনায় "অনেক বেশি সতর্ক" এবং "চৌকস"।
তিনি বলেন, এখনকার শিক্ষার্থীরা আমাদের মতো হিংসাত্মক নয়, যেমন পুলিশকে শূকর বলা বা 'বাধার বিরুদ্ধে, মাদারফাকার' বলা- এই ধরনের পাগলামি নেই।
গাজা আন্দোলনের সর্বশেষ
কলম্বিয়ার বিক্ষোভকারীরা গেলো ১৭ এপ্রিল কলেজের দক্ষিণ লনে গাজা সলিডারিটি ক্যাম্প স্থাপন করে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সাথে ব্যবসা করে এমন কোম্পানিগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে আহবান জানায়।
বিক্ষোভ বন্ধ করতে ১৮ এপ্রিল নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে (এনওয়াইপিডি) ডাকা হয় এবং ১০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে গণগ্রেপ্তারের পরেও থেকে থাকেনি এ আন্দোলন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিনোচে শফিক আগে বলেছিলেন, ক্যাম্পাসে এনওয়াইপিডিকে ডাকার ফল বিপরীত হতে পারে। যদিও পরে বিক্ষোভকারীদের ক্যাম্পাস খালি করতে সোমবার দুপুর ২টা পর্যন্ত চূড়ান্ত সময় দেন তিনি।
সবশেষ মঙ্গলবার সকালে শিক্ষার্থীরা হ্যামিল্টন হলে প্রবেশ করার পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, যেসব শিক্ষার্থী হলের ভেতরে অবস্থান করবে তাদের বহিষ্কার করা হবে। এ পর্যন্ত কতজন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়।
এর আগে গেলো অক্টোবর মাসের ৭ তারিখে ইসরাইলে এই দশকের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান চালায় গাজার হামাস সরকার। এর পরপরই গাজায় বিমান হামলা ও স্থল হামলা শুরু করে ইসরাইল।
ইসরাইলি আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন ৮০ হাজারের বেশি মানুষ। এছাড়াও নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক হাজার গাজাবাসী।
এ গণহত্যা বন্ধের আহবান জানিয়ে জাতিসংঘ বলছে, ইসরাইলি আক্রমণের ফলে গাজার জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং ওষুধের তীব্র সংকটের মধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গাজার ৭০ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, গাজার ২২ লাখ অধিবাসী দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত ত্রাণ পৌঁছাতে না পারলে বিশ্বকে জবাবদিহি করতে হবে।