অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দখলদার ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েকদিন ধরে চলা বিক্ষোভ ক্রমান্বয়ে সহিংস হয়ে উঠছে। দেশটির বিভিন্ন ক্যাম্পাস জুড়ে কমপক্ষে ৪০টি ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিবাদ শিবির স্থাপন করা হয়েছে। ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের বিক্ষোভ চলছে।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য। এরই মধ্যে শত শত শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে মার্কিন পুলিশ। কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। প্রশাসন চাপে রয়েছে। দেশটির ইতিহাসের এ ধরনের ঘটনা অতীতে কমই ঘটেছে।
একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিক্ষোভ দমনের প্রচেষ্টা চালালেও সফল হয়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ নির্মম আচরণের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমনের প্রচেষ্টা চালিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি নির্মমতার চিত্র উঠে এসেছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কোনো চেষ্টাই করেনি পুলিশ।

গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির বিক্ষোভ থেকে বেশ ক’জন শিক্ষার্থীকে পুলিশ আটকের পর আরও জোরালো হয়েছে আন্দোলন। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে তাদের প্রতিষ্ঠান প্রত্যাহার।
তবে শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই জন্য পুলিশ ডাকা হচ্ছে। গত এক সপ্তাহের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করায় প্রায় ৫৫০ জন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নির্যাতনের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এক বিক্ষোভকারী বলেন, আন্দোলন করা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। বাইডেন প্রশাসন তাতে শিক্ষার্থীদের বাধা দিচ্ছে, গ্রেফতার করছে। যা খুবই ঘৃণিত। আমরা গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতির নিশ্চয়তা ছাড়া বাড়ি ফিরবো না। আমরা এবং আমেরিকার নাগরিকরা আর যুদ্ধ দেখতে চায় না।

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতেই প্রথম গাজার সমর্থনে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। চলতি সপ্তাহে বিভিন্ন বিক্ষোভ থেকে অন্তত সাড়ে পাঁচশ’ শিক্ষার্থীকে আটকের পর নতুন করে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। বিক্ষোভে যোগ দেন শিক্ষকরাও।
এনবিসি টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ৪০টিরও বেশি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ক্যাম্পাসে তাঁবু তৈরি করে গাজায় ইসরাইলে হামলা বন্ধের দাবি করছেন শিক্ষার্থীরা। নিউইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরাও গাজার সমর্থনে ক্লাসরুম থেকে নেমে এসেছে রাস্তায়। তবে শনিবারও বাইডেন প্রশাসনের নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের ধরপাকড় করে পুলিশ।

জর্জ ওয়াশিংটনের ভাস্কর্য ঢেকে দেয়া হয়েছে ফিলিস্তিনি পতাকায়। গণহত্যা বন্ধ কর, গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ বন্ধ কর, এমনই শ্লোগানে সরব ওয়াশিংটন ডিসির জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গণ। লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া শিক্ষার্থীরাও তাঁবু টানিয়ে ক্যাম্পাসেই দিনরাত কাটাচ্ছেন আন্দোলন করে। স্থায়ী যুদ্ধবিরতি না হওয়া পর্যন্ত এক চুলও নড়বেন বলে জানিয়েছেন না তারাও।
শনিবারও যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও ইউনিভার্সিটিতে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। এদিন সেখান থেকে অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া, অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রাঙ্গণেও দেখা যায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের তাঁবু টানানো ক্যাম্প। এসময় গণহত্যায় ইসরাইলকে সমর্থন ও অর্থায়নের জন্য বাইডেন প্রশাসনের নিন্দা জানান আন্দোলনকারীরা।

আমেরিকার বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের মূল দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইসরাইলকে কোনো ধরনের তহবিল দেয়া চলবে না। সেইসঙ্গে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে পুলিশকে ঢুকতে দেয়ার অনুমতি দেয়ায় প্রশাসনের বিচারও চেয়েছেন তারা। এই বিক্ষোভে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং এতে কয়েক ডজন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী যোগ দিয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও বিভিন্ন দেশে ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। জার্মানির বার্লিনে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টের সামনে তাঁবু খাটিয়ে ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে। লন্ডনের কেন্দ্রে শনিবার বিকেলে হাজারো মানুষ ফিলিস্তিনের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়েছে।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভকারীরা শুক্রবার সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস অবরুদ্ধ করে রাখে। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনলাইন ক্লাসের আয়োজন করতে বাধ্য হয়। সুইডেনের সড়কগুলো ‘ফিলিস্তিন মুক্ত কর’ ও ‘ইসরায়েলকে বয়কট কর’ শ্লোগানে মুখরিত ছিলো শনিবার।
ফিলিস্তিন শিক্ষার্থী বাসমার বদলে যাওয়া জীবন
ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী গ্রেপ্তার