নরেন্দ্র মোদীর, ‘অব কি বার ৪০০ পার’-স্লোগান ভেস্তে গেছে। লজ্জাজনক ইতিহাসও তৈরি করে দিয়েছে গেরুয়া শিবির। শুধু তা-ই নয়, মোদী লোকসভার ভেতরেই বলেছিলেন, বিজেপি একাই ৩৭০ পেরিয়ে যাবে। কিন্তু সেই লোকসভাতেই মোদীকে যেতে হবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে। ফলে সরকার গড়তে মোদী-শাহকে তাকিয়ে থাকতে হবে এনডিএ শরিকদের দিকে।
এই সব কিছু সম্ভব করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। রাহুলের কাছে নাজেহাল হয়েও সরকার গড়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী মোদী। তবে এনডিএ যে কেন্দ্রে সরকার গড়ছে তা নিশ্চিত করেছেন মোদী। ভোটের ফল প্রকাশের পর মোদী ভাষণে জোর গলায় বলেছেন তৃতীয়বার এনডিএ-র সরকার গঠন নিশ্চিত। মানুষ পূর্ণ বিশ্বাস রেখেছে বিজেপি এবং এনডিএ-র উপর।
কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, মোদীর ভাষণে বিজেপির থেকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে- এনডিএ। সময়ের করাল গ্রাসে এখন ‘পরনির্ভর’ মোদী বার বার এটাই বোঝাতে চেয়েছেন, শরিকদের নিয়েই সরকার গড়বেন তিনি। কিন্তু সরকার গড়ার অঙ্কটা কি এতোটাই সহজ? মুখে সরকার গড়ার ব্যাপারে কথা বললেও মোদী-শাহরা কি একটুও চিন্তিত নন? মঙ্গলবার বিকেলের পর থেকেই সর্বমহলে একই গুঞ্জন।
বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ঠিক এক বছর আগে জোটবদ্ধ হয়েছিল বিরোধীরা। তৈরি হয় ইনডিয়া জোট। এবারের লোকসভা নির্বাচনে সেই জোটই লড়াই করেছিল দেশজুড়ে। সেই জোটই এবারের নির্বাচনে ধাক্কা দিয়েছে বিজেপি তথা এনডিএকে। মোদীর ‘৪০০ পারের’ স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করেছে তারা। ভোটের ফলাফল অনুযায়ী, ইনডিয়ার ঝুলিতে রয়েছে ২৩০-২৩৫টি আসন।
অর্থাৎ সরকার গড়ার জাদু সংখ্যা ২৭২-এর থেকে বেশি দূরে নেই ইনডিয়া। তাই, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের পরই শুরু হতে পারে জোট ভাঙানোর খেলা। এনডিএ থেকে যদি ৪০ থেকে ৪৫ জন সদস্য ‘ইনডিয়া’ জোটে ভিড়ে যায়, তাহলে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়বেন মোদী। লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ব্যর্থ হলে সরকার গঠনের উদ্যোগ নেবে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট।
এটি আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কারণ, এনডিএ’র মধ্যে ভাঙা-গড়ার খেলা সেই ১৯৯৮ থেকে। কখনও শরিক দলের সংখ্যা বেড়েছে, আবার কখনও জোটের হাত ছেড়েছেন অনেকে। এমনও দল আছে, যারা জোটে এসেছে, আবার জোট থেকে বেরিয়ে গেছে, আবার ফিরেও এসেছে। তাই নতুন সরকার গড়ার জন্য বিজেপির একটাই কাজ। সেটি হলো, এনডিএ শরিকদের জোটে বেঁধে ফেলা।
সরকার গড়ার ‘ম্যাজিক ফিগার’ থেকে ২০-২২টি আসন বেশি পেয়েছে এনডিএ। এনডিএ শরিক দল হিসেবে বিজেপি সর্বোচ্চ ২৪০টি আসন পেয়েছে। এরপরই অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডুর দল তেলেগু দেশম পার্টি। তাদের ঝুলিতে ১৩ আসন। বিহারের নীতীশ কুমারের দল জেডিইউর ১২ আসন। এ ছাড়াও লোক জনশক্তি পার্টি, রামবিলাস পেয়েছে পাঁচটি আসন। একনাথ শিন্ডের শিবসেনা পেয়েছে ৭টি আসন।
আলোচনার কেন্দ্রে আছে ‘এন’ ফ্যাক্টর। এবার বিহারে নীতীশ এবং অন্ধ্রপ্রদেশে নাইডুকে পাশে না পেলে টানা তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হতে মোদীর স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতো। তবে অতীতে এই দু’দলের প্রধানের ‘পাল্টি’ খাওয়ার উদাহরণ আছে। মোদী ২০১৪ সালে যখন প্রথম দফায় সরকার গড়েছিলেন, এনডিএ-র শরিক ছিলেন নাইডু। পরে বনিবনা না হওয়ায় জোট থেকে বেরিয়ে যান। আবার ফেরেন ২০১৮ সালে।
আবার জেডিইউ-এর জোটে থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ নীতীশের জোট বদলের ইতিহাস রয়েছে। কখনও বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, আবার কখনও হাত ছেড়েছেন। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় এনডিএতে থাকলেও ২০১৯-এর লোকসভায় এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে যান নীতীশ। শুধু তাই নয়, বিজেপি বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখার পরও ভোটের আগে বেরিয়ে যান।
এরইমধ্যে দুই ‘এন’ এর কাছ থেকে লিখিত গ্যারান্টি পেয়েছেন মোদী। তবে আশা ছাড়ছে না কংগ্রেস। দলটির প্রধান মল্লিকার্জুন খগড়ে বলেছেন, নাইডু ও নীতীশের কাছে বার্তা পাঠানো আছে। ইনডিয়া জোটের দরজা তাদের জন্য সব সময় খোলা। আর সরকার গঠন ইনডিয়া কোন উদ্যোগ নেবে কি-না, এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে মল্লিকার্জুন জানিয়েছেন, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেবেন তারা।
শরিকদের একরাশ দাবি দাওয়াকে সামনে রেখে সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন- মোদী। যেহেতু, বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, তাই এবার দরকষাকষিতে জোরও পাবেন না মোদী। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব কারণেই জোটের মধ্যে শুরু হবে ভাঙ্গনের খেলা। আর সেই সুযোগের অপেক্ষাতেই বসে থাকবে কংগ্রেস। অর্থাৎ ঝোপ বুঝেই কোপটি মারবে কংগ্রেস তথা ইনডিয়া জোট।