ইসমাইল হানিয়া কি মোসাদের শিকার?

আর কত মুসলিম নেতাদের রক্ত নিলে ঠান্ডা হবে ওরা। কখনো রাতের আধারে চোরের মতো ঢুকে একের পর হত্যা, কখনো যানবাহন দুর্ঘটনার ছদ্মবেশে মুসলিম বিশ্বের প্রতিবাদী চরিত্রদের সরিয়ে দেয়ার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, তার সর্বশেষ নাম ইসমাইল হানিয়া। এখনো জানা যায়নি এই স্বাধীনতাকামী নেতার হত্যাকারী কে? কিন্তু ঘটনার পরম্পরা বলছে ইসরাইল ছাড়া এ ধরনের অপকর্ম ঘটানোর আর কে আছে। আর ইসরাইলের এ ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের হাতিয়ার দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।

গত কয়েক দশকে ভিনদেশের মাটিতে সবচেয়ে বেশি গুপ্তহত্যা ঘটিয়েছে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। মোসাদের টার্গেটের শীর্ষস্থানে থাকে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিরা। তারাই এই গোয়েন্দা সংস্থার টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছে বেশি। নিজেদের অবৈধ দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত করতে এরইমধ্যে হামাসের কয়েকডজন নেতাকে হত্যা করেছে দখলদার রাষ্ট্রটি। বিভিন্ন দেশে গিয়ে এসব কিলিং মিশন চালায় সংস্থাটি।

শুধু তাই নয়, ১৯৫৬ সালে মিসরের দুই সামরিক কর্মকর্তা মুস্তাফা হাফিজ ও সালাহ মুস্তফাকে পার্সেল বোমা পাঠিয়ে হত্যা করে ইসরায়েল। মনে করা হয়ে থাকে, তারাই মোসাদের টার্গেট কিলিং-এর প্রথম শিকার। সেই থেকে যে শুরু হয়েছে তা যা এখনও চলমান। ফিলিস্তিনে নিজেদের দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখতে অগুনতি মানুষকে হত্যা করেছে এই গোয়েন্দা সংস্থা।

হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়া।

ইসমাইল হানিয়া হত্যাকাণ্ডের পর আবারও সামনে মোসাদের কুখ্যাত কিলিং মিশনের পদ্ধতি। এর আগেও হামাসের বহু প্রভাবশালী নেতা তেল আবিবের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ১৯৯৬ সালে মোসাদের গুপ্ত হামলায় নিহত হয় আলোচিত হামাস নেতা বোমা তৈরির ইঞ্জিনিয়ার ইয়াহইয়া আয়াশ। ২০০৪ সালে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মিসাইল ছুড়ে হত্যা করা হয় সংগঠনের দুই প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমেদ ইয়াসিন ও আব্দুল আজিজ আল রান্তিসিকে।

২০০২ সালে কাশেম ব্রিগেডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সালাহ শাহাদিকে হত্যা করেছিল ইসরাইল। ২০০৪ সালে হামাসের সামরিক শাখার আরেক শীর্ষ নেতা আদনান আল ঘৌল এবং ২০২৪ সালে হামাস নেতা সালেহ আল-আরৌরিও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এই তালিকায় আছে হাজারো মুক্তকামী ফিলিস্তিনির নামও। এমনকি তাদের গুপ্তহত্যা থেকে রেহাই পায়নি হিজবুল্লাহর নেতারাও। সংগঠনটির সাবেক প্রধান সায়েদ আব্বাস আল মোসাউইকেও তার দেশ লেবাননেই হত্যা করেছে ইসরায়েল।

যদিও হত্যাচেষ্টায় ব্যর্থও হয়েছিল এই সংগঠনটি। জর্ডানে বিষ প্রয়োগে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছিল হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান খালেদ মেশালকে। কাশেম ব্রিগেডের প্রধান মোহাম্মদ দেইফ বেশ কয়েকবারই ইসরায়েলি গুপ্ত হামলার শিকার হয়েও বেঁচে আছেন।

মোসাদের কিলিং মিশন নিয়ে এখন পর্যন্ত বহু বিশ্লেষণও হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ইসরায়েলের বৃহত্তম গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়ে হত্যার টার্গেট নির্ধারণ করে এই দুর্ধর্ষ সংস্থাটি। যাকে হত্যার পরিকল্পনা নেওয়া হয়, দ্বিতীয় ধাপে এসে তার সম্পর্কে বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পর তা মূল্যায়ন করে মোসাদ।

মূল্যায়নকৃত প্রতিবেদন ইসরায়েলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধানদের নিয়ে গঠিত ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস কমিটির প্রধানের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই কমিটিই সুপারিশ হাজির করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা করা যায় কিনা। প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ২,১ জনকে সঙ্গে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। গুপ্তহত্যা পরিচালনায় গঠিত মোসাদের বিশেষ ইউনিট ক্যাসেরিয়া সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করে।

মোসাদের অভ্যন্তরীণ একটি ইউনিট ক্যাসেরিয়া। প্রধানত আরব বিশ্বে গুপ্ত অভিযান পরিচালনার স্বার্থে ৭০-এর দশকে গঠিত এই  ইউনিট বিশ্বের যেকোনও প্রান্তে গোয়েন্দা মোতায়েন ও পরিচালনা করে থাকে। ক্যাসেরিয়া তার আরব রাষ্ট্র ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিদ্যমান ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য লক্ষ্য সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। এসব লক্ষ্যের ওপর নজরদারিও করে থাকে তারা।