আসছে নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এরিমধ্যে জমে উঠেছে দুই প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণা। ডেমোক্রেট প্রার্থী কমলা হ্যারিস ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে নির্বাচনী বিতকের মধ্যে দিয়ে আরও বেগ পেয়েছে প্রচার। যে সব অঙ্গরাজ্যে প্রবল লড়াই হতে পারে, সেখানে প্রচারে জোর দিয়েছেন দু’জন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার জমে উঠতেই এক নারীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য ও আলোচনা। ট্রাম্প শিবিরে দেখা মিলেছে আমেরিকার উগ্র ডানপন্থী এক নারীকে, নাম তার লরা লুমার। ট্রাম্প শিবিরে নাম লেখা হতেই এই উগ্র ডানপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট ছুটে গেছেন কমলা-ট্রাম্প বিতর্ক সভাস্থলে। আর এনিয়ে চর্চা চরমে।
একজন মুসলিমবিরোধী হিসেবে লরা লুমারের কুখ্যাতি রয়েছে। মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তিনি সুপরিচিত। এছাড়া নাইন ইলিভেনের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা মার্কিন সরকারের ভেতরের ষড়যন্ত্র ছিলো, এমন দাবির কারণেও আলোচনা ও শিরোনামে এসেছিলেন লরা লুমার।
গত বুধবার নাইন ইলিভেন হামলার স্মরণে একটি অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিয়েছিলেন লুমার। এনিয়ে কথা উঠেছিলো সর্বত্র। বেশ কিছু মিডিয়া ট্রাম্পের অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলো।
এরপরও ৩১ বছরের লরা লুমার প্রেসিডেন্ট বিতর্কের শহর ফিলাডেলফিয়াকে গিয়েছিলেন ট্রাম্পের বিমানে চড়েই।
সেই বিতর্কের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি ছিলো, যখন ট্রাম্প একটি ভিত্তিহীন দাবির পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, হাইতি থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীরা ওহাইও’র একটি ছোট শহরে গৃহপালিত পোষা প্রাণী খাচ্ছে। একই ধরনের বক্তব্য ট্রাম্প এর আগেও করেছিলেন, যার কোন ভিত্তি কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের ঠিক একদিন আগে লরা লুমার একই তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন। সোমবার, নিজের এক্স হ্যান্ডলে এই ধরনের কথা বলেন। এক্সে তার ১২ লাখ অনুসারী রয়েছে। রিপাবলিক দলের বহু নেতা বিরক্তির সঙ্গে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ভিত্তিহীন মন্তব্যের পেছনে লুমারের প্রভাব রয়েছে।
ট্রাম্পের প্রচার শিবিরের কর্মীরা আমেরিকার নিউজ আউটলট সিমাফোরের কাছে স্বীকার করেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে লুমারের ঘনিষ্ঠতা বিষয়টি তাদেরকে ভাবাচ্ছে এবং বিষয়টি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
তারা মনে করছেন, যদি ট্রাম্প সত্যিকার অর্থেই লরা লুমারকে কাছে টেনেছেন, তাহলে সেটি হবে তাদের প্রচারে বড় বাধা।
তবে লরা লুমার দাবি করেছেন, তিনি ট্রাম্পকে সাহায্য করার জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করছেন। তিনি ট্রাম্পকে আমেরিকান ‘জাতির শেষ আশা’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
তিনি এক্সে লেখেন, আমি আমার গল্প এবং কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত আছি এবং গণমাধ্যমের ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে পাত্তা দেয়ার সময় নেই।
১৯৯৩ সালে অ্যারিজোনায় জন্ম নেওয়া লুমার একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। প্রজেক্ট ভেরিটাস এবং ইনফোয়ার্সসহ বেশ কিছু সংস্থায় কর্মী এবং ভাষ্যকার হিসাবে কাজ করেছেন। ২০২০ সালে তিনি ফ্লোরিডা থেকে ট্রাম্পের সহায়তায় প্রতিনিধি পরিষদের প্রার্থী হলেও, ভোটযুদ্ধে হেরে যান।
দুই বছর পর তিনি আবারও একই চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। বর্তমানে ট্রাম্পের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক হিসাবেই বেশি পরিচিত লুমার। কমলা হ্যারিস ‘কালো’ নন এবং বিলিয়নেয়ার জর্জ সোরোসের ছেলে ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানিয়ে রহস্যজনক বার্তা পাঠাচ্ছেন এমন দাবিসহ নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারের জন্য পরিচিত।
এসব দাবি নিয়ে বিতর্কিত পোস্টের কারণে বেশ কয়েকটি সামাজিক মাধ্যম লুমারকে নিষিদ্ধ করে। এর মধ্যে রয়ে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম। এসব মাধ্যমে লুমারের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মুসলিমদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় ম্যাটা প্লাটফর্মে তিনি নিষিদ্ধ।
লুমার নিজেকে এক কঠোর মুসলিম বিদ্বেষী হিসাব দাবি করেন এবং ‘ইসলামোফবিয়া’র একজন গর্বিত কর্মী হিসাবে গর্ব বোধ করেন। এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিত আমেরিকার মুসলিম সমাজ কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। ট্রাম্পের প্রচার শিবিরের কর্মীরা জানান, লুমারের কারণে তারা মুসলিমদের সমর্থন হারাবেন।
লুমার প্রায়ই ট্রাম্পের সমর্থনে বিভিন্ন ইভেন্টে যোগ দেন এবং এর আগে তাকে তার ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের বাসভবন মার-এ-লাগোতে দেখা গেছে। এই বছরের শুরুতে তিনি আইওয়াতে ট্রাম্পের বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন। ট্রাম্প তার নিজস্ব সমাজিক মাধ্যম ট্রুথে লুমারের বেশ কিছু ভিডিও শেয়ারও করেছেন।
গত বছর নিউইয়র্ক টাইমস রিপোর্ট করেছে যে, ট্রাম্প তার প্রচারের জন্য লুমারকে নিয়োগ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগীরা সতর্ক করে দিয়ে জানান, এ ধরনের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে। এমন প্রতিক্রিয়ার পর ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন বলে জানা গেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি