কিছু শক্তি হারিয়ে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূলের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে গেল দেড়শ’ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিধ্বংসী হারিকেন ‘মিল্টন’। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টার (এনএইচসি) জানিয়েছে, এটি এখন চার মাত্রার হারিকেন, অর্থাৎ যাত্রাপথে কিছু শক্তি ক্ষয় হয়েছে সেটির।
এনএইচসির সর্বশেষ বার্তায় বলা হয়, হারিকেনের বাতাসের গতি ১৫৫ মাইলে (২৫০ কিলোমিটার) এসে ঠেকেছে। যা ক্যাটাগরি-৫ মাত্রায় থাকা অবস্থার চেয়ে মাত্র দুই মাইল কম। ১৩১ থেকে ১৫৫ মাইল গতির ঝড়কে ক্যাটাগরি-৪ এবং ১৫৫ মাইলের বেশি গতিবেগ থাকলে তা ক্যাটাগরি-৫ মাত্রায় ধরা হয়।
বিবিসি ও সিএনএন জানিয়েছে, ফ্লোরিডার ফোর্ট মায়ার্সসহ উপকূলবর্তী শহরের আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। যে কোনো সময় ভারী বৃষ্টি শুরু হতে পারে। বর্তমানে কোথাও কোথাও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। অপরদিকে সাগর বেশ উত্তাল। স্বাভাবিকের চেয়ে ঢেউয়ের উচ্চতা বেড়ে আশপাশ প্লাবিত করেছে।
মাত্রা কমলেও মিল্টন এখনো অতিবিপজ্জনক মাত্রার হারিকেন। বাতাসের গতি ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার। এনএইচসি বলেছে, মিল্টনের কেন্দ্রটি বুধবার মেক্সিকোর পূর্ব উপসাগরজুড়ে চলে যাবে, গভীর রাতে বা বৃহস্পতিবার ভোরে ফ্লোরিডার পশ্চিম-মধ্য উপকূল বরাবর আঘাত হানবে।
আর, বৃহস্পতিবার বিকেলে পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে ফ্লোরিডার পূর্ব উপকূল থেকে সরে যাবে। এই নিয়ে, হারিকেন হেলেনের বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই অঙ্গরাজ্যটি আবারও দুর্যোগের মুখে পড়ল। এরিমধ্যে ফ্লোরিডার বাসিন্দাদের ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দারা তড়িঘড়ি করে জরুরি প্রস্তুতি শেষ করছেন। কেউ আবার এরই মধ্যে ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছেন। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডেসানটিস বলেন, ফ্লোরিডায় কয়েক ডজন আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। নিরাপদ এলাকায় এসব আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে।
উপকূলীয় এলাকার মানুষকে বিভিন্ন সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ সতর্কতায় টাম্পার জাতীয় আবহাওয়া সার্ভিস এক বিবৃতিতে বলেছে, যদি ঝড়টির গতিপথ একই রকম থাকে, তাহলে এটি ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বিধ্বংসী ঝড় হবে। মিল্টন এখনো ফ্লোরিডা উপকূলের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে অবস্থান করছে।
জাতীয় আবহাওয়া সার্ভিস জানিয়েছে, পাঁচ মাত্রার হারিক্যান মিল্টনে উপকূলে ১৮ ফুট বা ৫ মিটার উচ্চতার ঢেউ আঘাত হানতে পারে। এতে গত ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ে গাছ ও বিদ্যুতের লাইনগুলো উপড়ে পড়বে। ফলে আবাসিক এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
হারিকেনটি রোববার পর্যন্ত এক ক্যাটাগরিতে ছিলো। পরবর্তীতে এটি দ্রুত শক্তি সঞ্চার করে চার মাত্রায় রূপ নেয়। সবশেষ এটি পাঁচ মাত্রায় পৌঁছে। পরে আবার চার মাত্রায় নামিয়ে আনা হয়। ঝড়টি মেক্সিকো উপসাগর হয়ে ফ্লোরিডায় আঘাত হানবে। ফ্লোরিডার ৬০ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হয়েছে।
ফ্লোরিডার ৫১টি শহরে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয় স্কুল-কলেজ। অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর রন ডিসানটিসের তথ্য মতে, হারিকেনটি খুব কাছে অবস্থান করছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে মঙ্গলবারই সম্ভাব্য বিপর্যয়কর ঝড়ের ক্রমবর্ধমান কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এরপরই সঙ্গে সঙ্গে বাসিন্দারা ফ্লোরিডা ছেড়ে যেতে শুরু করেন। ব্যক্তিগত গাড়ি, কেউ বা দল বেঁধে আবার কেউ পরিবহন যানে করে এলাকা ছাড়ছেন। গাড়ির চাপ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে। এমনকি কোনো কোনো এলাকায় তীব্র যানজট মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে।
তবে কর্তৃপক্ষ চাচ্ছে মানুষ এভাবে যেন ঝড়ের সম্ভাব্য অঞ্চল ছেড়ে চলে যান। কারণ, বিপুল বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া এবং আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা দেওয়া অসম্ভব। স্থানীয়ভাবে কেবল ৩৬টি আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা গেছে। গভর্নর ডিসানটিস বাসিন্দাদের নিচু এলাকা থেকে দূরে সরে যেতে আহ্বান জানিয়েছেন।
দক্ষিণ ফ্লোরিডার পেট্রোল স্টেশনগুলোয় লম্বা লাইন দেখা গেছে। অনেক স্টেশনে এরই মধ্যে জ্বালানি শেষ হয়ে এসেছে। এ বিষয়ে গভর্নর ডেসানটিস বলেন, নিরবচ্ছিন্ন অপসারণ কার্যক্রম চালানোর জন্য স্টেশনগুলোয় পেট্রোল সরবরাহ করা হচ্ছে। রাস্তার পাশে চার্জিং স্টেশন বসানো হয়েছে।
উদ্ধার তৎপরতার জন্য হাজার হাজার ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ৩৪টি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া ঝড়ের কারণে ফ্লোরিডায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে তা মেরামতের জন্য ৩৭ হাজার লাইনম্যানকে রাজ্যে পাঠানো হয়েছে।
জাতীয় মহাসাগরীয় বায়ুমণ্ডলীয় সমিতির (নোয়া) তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪০টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে চারটি উপকূলে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে আঘাত হানে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপিতে ১৯৬৯ সালে হারিক্যান ক্যামিলি আঘাত হানে। ২৪ ফুট উচ্চতার ঢেউ তৈরি করে। এর ভয়াবহতার ফলে উপকূলের প্রায় সবকিছু ধ্বংস হয়েছিল। এই ঘূর্ণিঝড়ে ভার্জিনিয়ায় ২৫৯ জন মারা যান। এর ফলে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ক্ষতি হয়।
ফ্লোরিডায় ১৯৯২ সালে ঘূর্ণিঝড় হারিক্যান অ্যান্ড্রু আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের গতি ছিল প্রতি ঘণ্টায় ১৬৫ থেকে ১৭৪ মাইল। এই ঘূর্ণিঝড়ে ২৬ জন মারা যান। আহত হন বেশ কয়েকজন। এই হ্যারিক্যান যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হয়। এতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ফ্লোরিডায় ২০১৮ সালে হারিক্যান মাইকেল আঘাত হানে। প্রতি ঘণ্টায় ১৬০ মাইল বাতাসের গতির ঘূর্ণিঝড়টি অন্যতম ভয়াবহ হিসেবে ধরা হয়। এতে ৭৪ জন মারা যান, ক্ষতি হয় ২৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের। আর, সম্প্রতি আঘাত হানা হ্যারিকেন হেলেনের চার মাত্রার ছিল। এতে ২০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা যান। এর আগে ২০০৫ সালে ক্যাটরিনা যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে আঘাত হানে।
সবশেষ আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, হারিকেন মিল্টনের কেন্দ্রটি বুধবার মেক্সিকোর পূর্ব উপসাগর জুড়ে তাণ্ডব চালাবে। গভীর রাতে বা বৃহস্পতিবার ভোরে ফ্লোরিডার পশ্চিম-মধ্য উপকূল বরাবর আঘাত হানতে পারে। এরপর পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে ফ্লোরিডার পূর্ব উপকূল থেকে ধীরে ধীরে সরে যাবে। বৃহস্পতিবার বিকেলের মধ্যে ঝড়টি দুর্বল হয়ে পড়ার আশা করা হচ্ছে।