সিরিয়া কাঁপানো ১২ দিনে যেভাবে আসাদ সাম্রাজ্যের পতন

স্বৈরাচার বাশার আল-আসাদের ২৪ বছরের ‘সাম্রাজ্য’ মাত্র ১২ দিনের এক অবিশ্বাস্য অভিযানেই পতন ঘটিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে সিরিয়ার বিদ্রোহীর যোদ্ধারা। বিদ্রোহের মুখে পালিয়ে গেছেন আসাদ। তাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছে রাশিয়া। দেশ ছেড়ে সপরিবার সেখানেই আছেন তিনি।

২০১১ সাল থেকে সিরিয়ায় বাশার সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হলে তা রূপ নেয় গৃহযুদ্ধে। প্রথম থেকেই এই যুদ্ধে বিদ্রোহীদের সমর্থন করেছিল আমেরিকা। অন্য দিকে, বাশারকে সমর্থন দেয় রাশিয়া ও ইরান।  এই জোরেই গত ১৩ বছর ধরে কঠিন হাতে বিদ্রোহ দমন করে আসছিলো বাশারের প্রশাসন। 

asad2

কিন্তু তার পতনের সূচনা হয় গত ২৭ নভেম্বর। মাত্র ১২ দিনে বাশারের সরকার পড়ে যায়।  কী এমন হলো এই ১২ দিনে? ১৩ বছরের চেষ্টায় যা হয়নি, তা কী ভাবে মাত্র ১২ দিনে করে দেখালেন বিদ্রোহীরা? কোন ম্যাজিক ছিলো তাদের হাতে। একনজরে সিরিয়া কাঁপানো সেই ১২ দিন ফিরে দেখা যাক। 

২৭ নভেম্বর: উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় সরকার নিয়ন্ত্রিত আলেপ্পো প্রদেশের ১৫টির বেশি গ্রাম দখলে নেওয়ার দাবি করে বিদ্রোহীরা। অভিযানের নেপথ্যে ছিল এইচটিএস। সরকারের তরফে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। বিদ্রোহীদের উপর আকাশ থেকে বোমাবর্ষণ করে সিরিয়া সরকার এবং তার সহযোগীরা।

২৮ নভেম্বর: রাশিয়ার বিমান হামলা এবং সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর প্রতিরোধে কোনোই লাভ হয়নি। উল্টো আলেপ্পোর উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আরও এগোতে শুরু করে বিদ্রোহীরা। সীমান্ত লাগোয়া ইদলিব প্রদেশে তাঁরা ঢুকে পড়েন বিদ্রোহীরা।  সেখান থেকেও পিছু হটে বাশারের অনুগত সেনাবাহিনী। 

২৯ নভেম্বর: সিরিয়ার বৃহত্তম শহর আলেপ্পোতে ঢুকে পড়ে বিদ্রোহী যোদ্ধারা।  রাশিয়া ও ইরানের সহায়তায় সিরিয়া সরকার ২০১৬ সালে আলেপ্পোয় সামরিক অভিযান চালিয়ে বিদ্রোহীদের তাড়িয়ে দিয়েছিলো। ২৯ নভেম্বর আবার সেই শহরে প্রবেশ করে তারা। কিন্তু এবার তেমন কোনও বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি।

৩০ নভেম্বর: বিদ্রোহীরা ঘোষণা করে, আলেপ্পো তাদের দখলে। শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দখলও নিয়ে নেয় তারা। শহরের প্রাণকেন্দ্রে পুঁতে দেন নিজেদের পতাকা। মধ্য সিরিয়ার হামা প্রদেশের অন্তত চারটি শহর ওই দিন সন্ধ্যার মধ্যেই বিদ্রোহীদের দখলে চলে যায়। প্রাদেশিক রাজধানীতেও ঢুকে পড়ে বিদ্রোহীরা।

১ ডিসেম্বর: পাল্টা আঘাত হানে সিরিয়া সরকার। দেশের সেনাবাহিনী ইদলিব এবং আলেপ্পোতে আকাশপথে হামলা চালায়। সড়কপথেও সিরিয়ার সেনা বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হয়। ওই দিনই দামেস্কে যান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। প্রেসিডেন্ট বাশারকে তিনি আশ্বাস দেন, তেহরান তাঁর পাশে আছে।

২ থেকে ৪ ডিসেম্বর: এক দিকে বাধা পেয়ে অন্যদিকে অগ্রসর হয় বিদ্রোহীরা। দক্ষিণে এগিয়ে হামা শহরের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ঢুকে পড়ে তারা। রাজধানী দামেস্ক থেকে হামার দূরত্ব মাত্র ২০০ কিলোমিটার। এই পর্যায়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য বাশারকে অনুরোধ করে তুরস্ক।

৫ ডিসেম্বর: হামা শহরে ঢুকে পড়ে বিদ্রোহীরা। এই শহরের আসি স্কোয়্যার এলাকা ২০১১ সালের বিদ্রোহের ‘আঁতুড়ঘর’ ছিল। ২০২৪-এ এসে আবার সেখানে আধিপত্য কায়েম করে বিদ্রোহী বাহিনী। আনন্দে শূন্যে গুলি ছুড়তে দেখা যায় তাদের।  এইচটিএস ঘোষণা দেয়, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য দামেস্ক। 

৬ ডিসেম্বর: আরও এগিয়ে সিরিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর হোমসে ঢুকে পড়ে বিদ্রোহীরা।  এ শহরটি রাজধানীর প্রবেশপথ। হোমসেও পিছু হটে সরকারি বাহিনী।  এ পর্যায়ে সিরিয়া নিয়ে কাতারের রাজধানী দোহায় উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়। তাতে যোগ দেন সৌদি আরব, মিশর, তুরস্ক, ইরান এবং রাশিয়ার প্রতিনিধি।

৭ ডিসেম্বর: হোমস থেকে সরকারের সব বাহিনী সরে গেলো শহরটি পুরোপুরি বিদ্রোহীদের দখলে চলে যায়। তাঁরা ঘোষণা করেন, দামেস্ক তারা ঘিরে ফেলেছে। অভিযানের শেষ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন। এরপরই শুরু হয় রাজধানী মুখে বিদ্রোহীদের সাঁড়াশি অভিযান। বিনা বাধায় তারা ঢুকে পড়ে শহরের কেন্দ্রে। 

৮ ডিসেম্বর: সিরিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যমে ঘোষণা আসে, বাশার সরকার পড়ে গিয়েছে। বন্দিদের মুক্ত করা হয়েছে। বিদ্রোহী নেতা জোলানি দামেস্কের মসজিদে যান এবং জয় ঘোষণা করেন। এর আগেই বাশার সিরিয়া ছেড়ে রাশিয়ায় চলে যান। সিরিয়ার প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার বিদ্রোহীদের সঙ্গে হাত মেলাতে প্রস্তুত।