ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক নিয়ে এক দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শুক্রবার মস্কোয় প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা স্থায়ী এক ম্যারাথন সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে জানান, ইউক্রেন অভিযানের পর রাশিয়া আর কোনো যুদ্ধ চায় না, তবে এর জন্য পশ্চিমাদের রুশ স্বার্থের প্রতি ‘সম্মান’ দেখাতে হবে। ইউরোপে রাশিয়ার হামলার পরিকল্পনাকে তিনি ‘বাজে কথা’ বলেও উড়িয়ে দেন। এই সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদরা অংশ নেন।
বিবিসির রাশিয়া সম্পাদক স্টিভ রোজেনবার্গ পুতিনকে প্রশ্ন করেন, ভবিষ্যতে আর কোনো ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ (ইউক্রেন আক্রমণের রুশ পরিভাষা) চালানোর পরিকল্পনা রাশিয়ার আছে কি না?
জবাবে পুতিন বলেন, যদি আপনারা আমাদের সম্মান করেন এবং আমাদের স্বার্থের গুরুত্ব দেন, তবে নতুন কোনো অভিযানের প্রয়োজন হবে না। ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ নিয়ে আপনারা আমাদের সাথে যে প্রতারণা করেছেন, তার পুনরাবৃত্তি না হলেই কেবল শান্তি বজায় থাকবে।
ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা ও ইউক্রেনের অবস্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগকে ‘আন্তরিক’ বলে প্রশংসা করেছেন পুতিন। তিনি জানান, যুদ্ধের বল এখন পশ্চিমা দেশগুলোর কোর্টে। তবে পুতিন শান্তি আলোচনার জন্য তার আগের শর্তগুলোতেই অনড় রয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের দখল করা চারটি অঞ্চল থেকে কিয়েভের সেনা প্রত্যাহার এবং ন্যাটোর সদস্যপদ পাওয়ার আশা ত্যাগ করা।
এছাড়া ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউক্রেনে নতুন নির্বাচন দেয়ার দাবিও জানান তিনি। পুতিন প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচন চলাকালীন রাশিয়া ইউক্রেনে বোমা বর্ষণ বন্ধ রাখবে।
অর্থনীতির চাপ ও অভ্যন্তরীণ সমালোচনা
এবারের ‘ডাইরেক্ট লাইন’ অনুষ্ঠানে রাশিয়ার নিম্নগামী অর্থনীতি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে মানুষের ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা গেছে। টিভি স্ক্রিনে ভেসে ওঠা দর্শকদের বার্তায় ‘পাগলামি মূল্যের লাগাম টানার' আকুতি দেখা যায়। আগামী ১ জানুয়ারি থেকে রাশিয়ায় ভ্যাট ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২২ শতাংশ করা হচ্ছে। যদিও ক্রেমলিন রাশিয়ার অর্থনীতির সহনশীলতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে, তবে জনগণের মধ্যে ইন্টারনেটের বিভ্রাট এবং জীবনযাত্রার মান নিয়ে অসন্তোষ স্পষ্ট ছিলো।
পুতিন যখন মস্কোর সংবাদ সম্মেলনে শান্তির কথা বলছিলেন, ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা পরেই ইউক্রেনের ওডেসা অঞ্চলে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাতজন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউ দাবি করেছে, তারা ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ার একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে সফল হামলা চালিয়েছে।
পুতিন অবশ্য দাবি করেছেন যে, রাশিয়ার রপ্তানি বা অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাব পড়বে না।
যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে বড় ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দল আলোচনায় বসেছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটিশ কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত আছেন। এমনকি ক্রেমলিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিভও এই সপ্তাহান্তে মায়ামিতে পৌঁছাতে পারেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টার এই অধিবেশনের শেষ দিকে পুতিন কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ব্যক্তিগত জীবনের প্রশ্নে তিনি জানান, তিনি ‘প্রথম দেখায় প্রেমে’ বিশ্বাস করেন এবং বর্তমানে তিনি নিজেও প্রেমে পড়েছেন। তবে কার প্রেমে পড়েছেন, তা তিনি খোলসা করেননি।