মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে চরম সংশয় ও বিতর্কের মধ্যেই দেশটিতে সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এটিই দেশটিতে প্রথম নির্বাচন।
জান্তা সরকার দাবি করছে, এই নির্বাচন এই দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ। তবে জাতিসংঘ, পশ্চিমা দেশসমূহ এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, জান্তা-বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল এতে অংশ না নেয়ায় এই নির্বাচন কোনোভাবেই অবাধ, সুষ্ঠু বা গ্রহণযোগ্য নয়।
২০২০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেত্রী অং সান সু চি এখনও বন্দি এবং তার দলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
পার্লামেন্টই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে: জান্তা প্রধান
রোববার স্থানীয় সময় সকাল ছয়টায় ভোট শুরু হওয়ার পর ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের মতো বড় শহরগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি ছিলো সামান্য। জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং কড়া নিরাপত্তার মধ্যে রাজধানী নেপিদোতে ভোট দেন। ভোট দেয়ার পর তিনি হাসিমুখে কালিযুক্ত আঙুল উঁচিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে পোজ দেন।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা তার আছে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জেনারেল হ্লাইং বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা নন। তিনি আরও যোগ করেন, পার্লামেন্ট যখন বসবে, তখন সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একটি প্রক্রিয়া রয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই পদের জন্যই অত্যন্ত কৌশলে এগোচ্ছেন জান্তা।
এগিয়ে সামরিক বাহিনী সমর্থিত দল
সু চি-র দল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশজুড়ে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা সামরিক বাহিনী নৃশংসভাবে দমন করে। এরপর সাধারণ মানুষ অস্ত্র তুলে নিলে দেশটিতে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।
কাসেতসার্ট ইউনিভার্সিটির মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ ললিতা হানওং বলেন, এই নির্বাচনটি করা হয়েছে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদের নেতৃত্বাধীন 'ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি' (ইউএসডিপি) এবং তাদের মিত্র দলগুলো মিলে মিয়ানমারের পরবর্তী সরকার গঠন করতে যাচ্ছে- এটা অনেকটা নিশ্চিত।
রোববার শুরু হওয়া এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলবে আরও দুই দফায় (১১ ও ২৫ জানুয়ারি)। দেশটির ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে ২৬৫টিতে ভোট হবার কথা থাকলেও জান্তার অনেক অঞ্চলের ওপরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও জান্তার অবস্থান
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক গত সপ্তাহে সতর্ক করেছিলেন, ব্যাপক সহিংসতা ও দমনের পরিবেশে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বড় শহরগুলোর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বিগত নির্বাচনগুলোর মতো কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনা এবার দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনী প্রচারণাতেও কেবল ইউএসডিপি-র আধিপত্য লক্ষ্য করা গেছে।
তবে জান্তা সরকার দাবি করছে, এই নির্বাচন সংঘাত থেকে উত্তরণের পথ দেখাবে। তারা জালিয়াতি রোধে এবারই প্রথম ৫০ হাজারেরও বেশি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার করছে। রাশিয়া, চীন, বেলারুশ ও ভারতসহ কয়েকটি দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল এই ভোট পর্যবেক্ষণ করতে এসেছে।
জান্তা মুখপাত্র জাও মিন তুন স্বীকার করেছেন, আন্তর্জাতিক মহলে এই নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা হবে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং এক সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি হবে।