ভারতে দুই জনপ্রিয় ছাত্র আন্দোলনকারীকে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিনা বিচারে কারাবন্দি রাখার পর তাদের জামিন নামঞ্জুর করা হয়েছে। সোমবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের জামিনের আবেদন খারিজ করে দেন, যাদের ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার পর গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীতে প্রাণঘাতী দাঙ্গা উসকে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে। সেই দাঙ্গায় ৫৩ জন নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেয়া হয়েছে, যেখানে জামিন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। তারা বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন আদালতে জামিনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।
তবে আদালত একই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অন্য পাঁচ আন্দোলনকারীকে জামিন দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ভারতে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে কয়েক মাসব্যাপী চলা আন্দোলনের সময় এই দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল। জাতিসংঘ ওই আইনটিকে মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক বলে অভিহিত করেছিল।
আইন বিষয়ক ওয়েবসাইট 'বার অ্যান্ড বেঞ্চ'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার সকালে সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ বলেন, অভিযুক্ত সাতজনের জামিন আবেদন আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়েছে কারণ অপরাধের গুরুত্বের বিচারে তারা সবাই সমান পর্যায়ে নেই।
বিচারপতিরা খালিদ এবং ইমামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে অন্যদের চেয়ে আলাদা ও গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের জামিন প্রত্যাখ্যান করেন। আদালত আরও জানিয়েছে, এই দুই আবেদনকারী এক বছর পার হওয়ার আগে পুনরায় জামিনের আবেদন করতে পারবেন না।
উমর খালিদ ২০১৯ সালে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। শারজিল ইমামও গ্রেপ্তারের সময় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল স্কলার ছিলেন। বর্তমানে দুজনেরই বয়স ৩৭ বছর।
কারাবন্দি এই আন্দোলনকারীদের মামলাটি ভারতে এবং বিশ্বজুড়ে ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্টের একজন সাবেক বিচারপতি এবং উচ্চ আদালতের তিনজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিসহ একটি প্যানেল তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছিলেন, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনার মতো কোনো জোরালো প্রমাণ তারা পাননি।
এমনকি গত সপ্তাহেই মার্কিন কংগ্রেসের একদল সদস্য ও সিনেটর ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। সেখানে তারা এই আন্দোলনকারীদের দীর্ঘমেয়াদী প্রাক-বিচার আটকাদেশ নিয়ে তাদের নিরবচ্ছিন্ন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এ পর্যন্ত তাদের জামিন না পাওয়ার মূল কারণ হলো কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন 'ইউএপিএ' । এই আইনের অধীনে অভিযুক্ত হলে জামিন পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বছরের পর বছর কারাবন্দি থাকতে হয়। গত পাঁচ বছরে অন্তত পাঁচবার উমর খালিদের জামিন আবেদন বিভিন্ন আদালতে খারিজ হয়েছে। শারজিল ইমামের আবেদনও এর আগে দুবার প্রত্যাখ্যান করা হয়।
সোমবার যে পাঁচজন জামিন পেয়েছেন তারা হলেন- গুলফিশা ফাতিমা, মীরান হায়দার, মোহাম্মদ সেলিম খান, শাদাব আহমেদ এবং শিফা উর রহমান। এদের মধ্যে ৩২ বছর বয়সী ফাতিমা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্নাতক, আর বাকিরা নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদ জানানো মানবাধিকারকর্মী।
আন্দোলনকারীরা আদালতে যুক্তি দেন, কোনো প্রমাণ ছাড়াই তারা পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন এবং এই দীর্ঘ সময় ধরে আটকাদেশ আসলে বিনা বিচারে শাস্তির নামান্তর।