জনরোষ আর বিদেশি হুমকিতে অস্তিত্ব সংকটে ইরান!

ইরানে বিক্ষোভ নতুন কিছু নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত এই দেশটি বারবার গণবিক্ষোভের ঢেউয়ে কেঁপে উঠেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের প্রাণঘাতী অস্থিরতা নজিরবিহীন। অভ্যন্তরীণ প্রচণ্ড চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী হুমকির এক মারাত্মক সংমিশ্রণ ইরানের নেতাদের সামনে পরবর্তী পদক্ষেপের পথ সংকুচিত করে দিয়েছে। খবর আল জাজিরা। 

গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে মুদ্রার মান পড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই দেশব্যাপী এক বিশাল আন্দোলনে রূপ নেয়। যেখানে সমাজের সব স্তরের মানুষের এক বিরল সংহতি দেখা গেছে। ইরানের মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতন ছিল সংকটের দীর্ঘ তালিকার একটি অংশ মাত্র- পানি ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি আগে থেকেই সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা ইরানিদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দমনে কর্তৃপক্ষের সক্ষমতার ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছে লাখো মানুষ। পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জুনে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দেন এবং এখন বিক্ষোভকারীদের সাহায্য করার অজুহাতে পুনরায় হামলার জোরালো হুমকি দিচ্ছেন।

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি বলেন, এবারের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনেক বেশি নাজুক, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক বেশি খারাপ এবং খোদ শাসনব্যবস্থার ভেতরেই ভিন্নমত এখন আগের তুলনায় অনেক গভীরে।

অচলাবস্থায় সরকার শুরুতে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন এবং কিছু মৌলিক পণ্যের আমদানিতে বিশেষ বিনিময় হার বাতিল করে মাসিক সাত ডলারের নগদ অর্থ সহায়তার মতো কিছু অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করেছিল। 

কিন্তু এসব পদক্ষেপে জনগণের কোনো সাড়াই মেলেনি। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া আরও সহিংস হয়ে ওঠে। গত ৮ জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা জারি করা হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিপক্ষে থাকা অধিকারকর্মীদের মতে, নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে, যদিও আল জাজিরা স্বাধীনভাবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোকসান ফারমান ফারমাইয়ান বলেন, আমরা দেখছি এই শাসনব্যবস্থা এখন অত্যন্ত জনবিচ্ছিন্ন এবং অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের পথ তাদের হাতে নেই; তারা এখন কার্যত একটি ‘ডেড এন্ড’ বা কানাগলিতে দাঁড়িয়ে আছে।

ভেনেজুয়েলা মডেলের আতঙ্ক 

ইরানের ওপর চাপ কেবল ভেতর থেকেই নয়, বাইরে থেকেও আসছে। ২০২৩ সাল থেকে ইসরাইলের বহুমুখী আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং গত জুনের ১২ দিনের লড়াই ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। তেহরানের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল এই বিক্ষোভকে যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

এ অবস্থায় ইরানের সেনাবাহিনী- যারা সাধারণত আইআরজিসি’র মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলায় না, তারা সরকারকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়ে কৌশলগত স্থাপনা রক্ষার অঙ্গীকার করেছে। পার্সি বলেন, তেহরান মনে করছে ইসরাইল আরেকটি যুদ্ধের জন্য জমি তৈরি করছে। একে তারা অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে গত ৩ জানুয়ারি ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয়, তিনি বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের সরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী ভূমিকা নিচ্ছেন। 

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়ালি নাসর বলেন, ইরান হয়তো ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আক্রমণের বদলে সুনির্দিষ্ট হামলার মাধ্যমে শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে চায়, যাতে বাকিরা পারমাণবিক বা মিসাইল ইস্যুতে ওয়াশিংটনের কথা মানতে বাধ্য হয়।

ভবিষ্যৎ কোন দিকে? 

এখন পর্যন্ত ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ এবং সশস্ত্র বাহিনীতে বড় কোনো ফাটল দেখা যায়নি। তবে আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো আলী আলফনেহ মনে করেন, ইরানের নেতৃত্ব এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

তিনি বলেন, তাদের সামনে এখন দুটি পথ, হয় তারা ট্রাম্পের সঙ্গে ‘ভেনেজুয়েলা-স্টাইল’ কোনো সমঝোতায় যাবে, যেখানে হয়তো মূল কাঠামো ঠিক রেখে নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে; অথবা তারা এক দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক বিপর্যয়, ধারাবাহিক গণবিক্ষোভ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ধীরে ধীরে ফাটল ধরার পথে হাঁটবে- যার চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে বর্তমান শাসনব্যবস্থার সম্পূর্ণ পতন।