ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতা, সহিংস বিক্ষোভের নেপথ্যে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর গোয়েন্দা সংস্থার হাত রয়েছে এবং তারা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে এই বিশৃঙ্খলা উসকে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এমন ধরনের অভিযোগ নতুন না হলেও, এবার বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
সোমবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশটির ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি এবং ভিন্নমত দমনের দিক থেকে নজর সরিয়ে দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি-তে দেয়া এক বক্তৃতায় তিনি দাবি করেন, গত বছরের জুনে ইসরাইলের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যারা ইরানের ওপর আঘাত হেনেছিল, তারাই এখন অর্থনৈতিক আলোচনার সূত্র ধরে এই অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, তারা দেশের ভেতরে ও বাইরে কিছু মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে; বাইরে থেকে কিছু সন্ত্রাসীকে ভেতরে ঢুকিয়েছে। পেজেশকিয়ানের দাবি, এই চক্রটিই উত্তরের শহর রাশতে একটি বাজারে হামলা চালিয়েছে এবং মসজিদে আগুন দিয়েছে। কোন মুসলিম মসজিদে আগুন দিতে পারে না।
ইরানের বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে সরাসরি বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা প্রতিদিন বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার সামরিক হামলার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, ইসরাইলের কট্টরপন্থী ঐতিহ্য বিষয়ক মন্ত্রী অমিচাই ইলিয়াহু গত সপ্তাহে আর্মি রেডিওকে বলেন, যখন আমরা ‘রাইজিং লায়ন’ (জুনে ইরানের ওপর ইসরাইলের হামলা) চলার সময় ইরানে হামলা করেছি, তখন আমরা সেদেশের মাটিতেই ছিলাম এবং জানতাম কীভাবে হামলার ভিত্তি তৈরি করতে হয়। আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি, বর্তমানে আমাদের কিছু লোক সেখানে কাজ করছে। তবে তিনি সরাসরি ইসরাইলি এজেন্টদের মাধ্যমে সরকার পতনের চেষ্টার দাবি করেননি।
চলতি মাসের শুরুতে সামাজিক মাধ্যমে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সিআইএ’র প্রাক্তন পরিচালক মাইক পম্পেও ইরানে ইসরাইলি এজেন্টদের উপস্থিতির কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন। তিনি লেখেন, রাস্তায় নামা প্রতিটি ইরানিকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। সে সঙ্গে তাদের পাশে হাঁটতে থাকা প্রতিটি মোসাদ এজেন্টকেও।

ইসরাইলের চিরশত্রু: সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবাননের সাথে যুদ্ধ এবং গাজায় চালানো গণহত্যার পরও অনেক ইসরাইলির কাছে ইরানই সব থেকে বড় এবং মারাত্মক শত্রু হিসেবে বিবেচিত। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার দাবি করেছেন, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে এবং তারা পুরো অঞ্চলজুড়ে ইসরাইলবিরোধীদের মদত দিচ্ছে।
ইসরাইলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গ বলেন, ইসরায়েলিরা এমন কোনো 'মাস্টারপ্ল্যান'-এর আশায় মরিয়া, যেখানে তারা তাদের ধ্বংসের হুমকি দেয়া যে কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে।
ইরানে গোপন অভিযান চালানোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ইসরাইলের। এর আগে তারা ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং ইরানি ভূখণ্ডের ভেতরে এজেন্ট ও অস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের এই উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং রাজনীতিকদের গুপ্তহত্যার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে পেজেশকিয়ানের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে তেহরানে নিহত হওয়া হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াহর হত্যাকাণ্ডও এর মধ্যে অন্যতম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত জুনের যুদ্ধের আগের সপ্তাহগুলোতে ইসরাইল ইরানের নিরাপত্তা বলয়ে গভীর অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছিল। সে সময় তারা শুধু বিজ্ঞানী বা কর্মকর্তাদের হত্যাই করেনি, বরং ইরানের ভেতর থেকেই ড্রোন সংযোজন ও উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম হয়েছিল।
কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক এবং ইসরাইলি গোয়েন্দা কার্যক্রম বিশেষজ্ঞ আহরন ব্রেগম্যান বলেন, আমার ধারণা, মোসাদ তেহরানে পর্দার আড়ালে সক্রিয়। ইসরাইলি কর্মকর্তারা অস্বাভাবিকভাবে নিশ্চুপ। তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন কোনোভাবেই নিজেদের সম্পৃক্ততা প্রকাশ না পায়।
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমানে ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় আমার ধারণা, রাস্তায় থাকা এজেন্টরা সেখান থেকে সরাসরি পরিস্থিতি রিপোর্ট করছে। বিশৃঙ্খলার কারণে এখন মাঠ পর্যায়ে কাজ করা তাদের জন্য সহজ। কারণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবচেয়ে বেশি নজর থাকে বিক্ষোভ দমনে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, দীর্ঘদিনের বিক্ষোভ ও অস্থিরতা ইরানের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে দুর্বল করে দিয়েছে, যা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। কঠোর নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি এবং বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর মতো বিষয়গুলো এই ফাটলকে আরও প্রশস্ত করেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজে আত্তার বলেন, ইসরাইলি এজেন্টরা যদি এখন ইরানের ভেতরে সক্রিয় না থাকে, তবে আমি খুবই অবাক হব। তারা এই বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে এবং আরও তীব্র করতে সব কিছুই করবে।
তিনি আরও বলেন, মূলত তারা বিক্ষোভকারীদের সবথেকে বড় প্রয়োজনটি মেটানোর চেষ্টা করবে, আর তা হলো বিশ্বজুড়ে প্রচার। বিক্ষোভকারীরা জানে যে ইরানের বর্তমান সরকার সহিংসতা চালাবে। তারা শুধু এটা জানতে চায় যে তাদের এই ত্যাগ বৃথা যাচ্ছে না।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র এখন ইন্টারনেট সুবিধা দেয়ার দিকেই মনোযোগ দেবে, যাতে মানুষ তাদের ওপর ঘটে চলা নির্যাতনের ভিডিও শেয়ার করতে পারে। চরম বিশৃঙ্খলার এই মুহূর্তে বিক্ষোভকারীরা হয়তো এটা ভাববে না যে এই সাহায্য কোথা থেকে আসছে।
থাইল্যান্ডে চলন্ত ট্রেনের ওপর ভেঙে পড়লো ক্রেন, নিহত ২২
নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতেই, একদিন আগে নয়-পরেও নয়: যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান উপদেষ্টা
ইরানি বিক্ষোভকারীদের ট্রাম্পের জোরালো বার্তা- ‘সাহায্য আসছে’