ইরানে রাতভর হাজার হাজার মানুষের রাজপথে নেমে আসার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বনেতারা এখন এক বড় প্রশ্নের মুখোমুখি- তবে কি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটতে যাচ্ছে? এই একটি ঘটনা বিশ্ব রাজনীতি এবং জ্বালানি বাজারের মানচিত্র বদলে দিতে পারে। প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ব্লুমবার্গ একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, যদি এই শাসনের পতন হয়, তাহলে এটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য একটি ধাক্কা হবে, যিনি এই মাসে মাদুরোর পরে এবং মাত্র এক বছর আগে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের উৎখাতের পর, আরেক বিদেশি মিত্রকে হারাবেন।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রশাসন এর আগেও বহুবার বিক্ষোভের মুখে পড়েছে, কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন তথ্যমতে, রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে ৯ কোটি মানুষের এই দেশটির ডজনখানেক শহরে লাখ লাখ মানুষ সরকারের হুমকি ও দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে এসেছে।

ভেনিজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোর পতনের পর উজ্জীবিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি বারবার ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আমেরিকা আবারও সরকার পরিবর্তন বা 'রেজিম চেঞ্জ' মিশনে ফিরছে।
বিশ্বনেতা ও বিনিয়োগকারীরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার মতে, মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা ইতিমধ্যেই ট্রাম্পকে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিকল্পগুলো সম্পর্কে ব্রিফ করেছেন। রোববার এয়ার ফোর্সেস ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমরা বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। সামরিক বাহিনী এবং আমরা কিছু অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপের কথা ভাবছি।
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশটিতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম পাঁচ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৬৩ ডলার ছাড়িয়েছে।

সিআইএ’র সাবেক জ্যেষ্ঠ মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক উইলিয়াম উশার বলেন, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এটিই ইরানের জন্য সবথেকে বড় মুহূর্ত। বর্তমানে দেশটির সরকার চরম সংকটে আছে এবং এর প্রধান কারণ হলো অর্থনীতি। আমার মনে হয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাদের হাতে সময় খুব কম এবং উপায়ও সীমিত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা- এইচআরএএনএ'র তথ্যমতে, গত দুই সপ্তাহে নিহতের সংখ্যা দু’হাজার ছাড়িয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে। মুদ্রা সংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও এখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন।
দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ইরানিদের শান্ত করতে সরকার ইন্টারনেট ও টেলিফোন নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। অনেক বিদেশি বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলবেন যাতে ‘স্টারলিঙ্ক’ স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করা যায়।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই হার্ডলাইন নীতি কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ভেনিজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির পর ইরান ইস্যু তার আমেরিকান আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের একটি বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তার মতে, গত জুনে ১২ দিনের বিমান যুদ্ধে ইরানকে আঘাত করা ইসরাইল এখন ইউরোপীয় সরকারগুলোর সঙ্গে ইরানের মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে। তিনি আরও যোগ করেন, ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটলে তা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য বড় ধাক্কা হবে, কারণ মাদুরো ও আসাদের পর তিনি আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হারাবেন।
তেল ব্যবসায়ীদের জন্য এখন সবথেকে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ইরানের প্রধান তেল উৎপাদনকারী প্রদেশ খুজেস্তান। সেখানে বড় কোনো বিশৃঙ্খলা এখনো না দেখা গেলেও, নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি তেল শ্রমিকদের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালেও তেল শ্রমিকদের ধর্মঘটই তার বাবার রাজতন্ত্রের পতনের অন্যতম কারণ ছিল।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর নেতারা এই অস্থিতিশীলতায় উদ্বিগ্ন। যদিও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে, কিন্তু তারা চায় না ইরানের পতন থেকে এমন কোনো শূন্যতা তৈরি হোক যা ওই অঞ্চলে নতুন করে গৃহযুদ্ধ বা সন্ত্রাসবাদ ডেকে আনে।
ইরান ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তাদের ওপর হামলা হলে অঞ্চলে থাকা মার্কিন সম্পদ ও ইসরাইল তাদের 'বৈধ লক্ষ্যবস্তু' হবে। যদিও ইরান অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েছে, কিন্তু তাদের হাতে এখনো শক্তিশালী ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং অনুগত রেভল্যুশনারি গার্ডস বাহিনী রয়েছে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের বিশ্লেষক দিনা এসফানডিয়ারি মনে করেন, ২০২৬ সালের শেষের দিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হয়তো বর্তমান রূপে টিকে থাকবে না। তার মতে, বড় কোনো বিপ্লবের চেয়ে আইআরজিসি’র মাধ্যমে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা বেশি, যেখানে হয়তো সামাজিক স্বাধীনতা কিছুটা বাড়বে কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও বিদেশনীতি আরও কঠোর হবে।
সবশেষে, সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক উইলিয়াম উশার সতর্ক করে বলেন, এই শাসনের পতন খুব একটা সহজ বা সুন্দর হবে না। ইরান ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগত অঞ্চলে ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং আইআরজিসি তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী লড়াই চালিয়ে যাবে।
ইরানি বিক্ষোভকারীদের ট্রাম্পের জোরালো বার্তা- ‘সাহায্য আসছে’
ইরানে বিক্ষোভের নেপথ্যে বিদেশিরা, পেজেশকিয়ানের বিস্ফোরক দাবি 