বঙ্গে সোমবারের সূর্যের সঙ্গে কি দিদিরও অস্ত?

‘সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, গণনা অনেক বাকি এখনও, জয় হবে আমাদেরই’! দলীয় প্রার্থী, কাউন্টিং এজেন্টদের ধৈর্য ধরতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তার সময় ইতিমধ্যে সন্ধ্যা গড়িয়েছে। পূবের সূর্যটা ইতিমধ্যে পশ্চিমে অস্ত গেছে। আর ততোক্ষণে বেসরকারি তথ্য বলছে, এবার অপেক্ষার পালা ফুরালো, ১৫ বছর পর অস্ত যেতে চলেছে দিদিরও। কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের সামনে ইতিমধ্যে বিজেপির সমর্থকরা উচ্ছ্বাস শুরু করেছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বিজেপি এগিয়ে আছে ২০০টি আসনে। যেখানে এর আগের নির্বাচনে (২০২১ সালে) তারা পেয়েছিলো ৭৭টি আসন। সেবার ২১৪ আসনে জয়ী হয়ে হয়ে সরকার গঠন করা তৃণমূল্য এবার এগিয়ে আছে মাত্র ৮৭টি আসনে। অর্থাৎ তার গতবারের চেয়ে পেছনে রয়েছে ১২৭টি আসনে। যেখানে বিজিপি গতবারের চেয়ে এগিয়ে ১২৩টি আসনে।

তবে ইলেকশন কমিশন অব ইন্ডিয়ার (ইসিআই) তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত বিজেপি এগিয়ে ১৮৫, আর তৃণমূল ৯১ আসনে গিয়ে।

দুটি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের এবার অস্ত প্রায় নিশ্চিত। তার ‘সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা’র যে বার্তা সেটি আর কাজে এলো না।

সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এক ভিডিও বার্তায় মমতা বলেন, ‘দয়া করে কোনো (তৃণমূল) প্রার্থী এবং কাউন্টিং এজেন্ট গণনাকেন্দ্র ছেড়ে আসবেন না। এটা বিজেপির প্ল্যান (পরিকল্পনা)।’ তিনি বলেন, ‘আমি গতকাল থেকে বলছি, ওদেরগুলো (এগিয়ে থাকা আসন) আগে দেখাবে। আমাদেরগুলো পরে দেখাবে। অনেক জায়গায় কাউন্টিংয়ের বন্ধ করে রেখে দিয়েছে। কল্যাণীতে এমন সাতটি মেশিন ধরা পড়েছে, যেখানে কোনো মিলই নেই। মমতা আরও বলেন, ‘কেন্দ্র জোর করে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে তৃণমূলের ওপর অত্যাচার করছে। অফিস ভাঙছে। জোর করে দখল করছে। এসআইআরের নামে ভোট লুট করেছে।

মমতার দাবি, এখনও তৃণমূল ১০০-র বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছে। সেগুলো বলছে না কমিশন। তিনি বলেন, ‘ইলেকশন কমিশন নিজের ইচ্ছামতো খেলছে। সঙ্গে রয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। আমাদের পুলিশরা মাথা নত করে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হয়ে কাজ করছে।

তিনি বলেন, মনখারাপ করার কারণ নেই। আমি বলেছিলাম, সূর্যাস্তের পরে আপনারা জিতবেন। তিন-চার রাউন্ড সবে কাউন্ট হলো। ১৮-১৯ রাউন্ড কাউন্ট হয়। তখন আপনারা জিতবেন। ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ। আপনারা সকলে জিতবেন। আমরা আপনাদের সঙ্গে রয়েছি।

অপরদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রত্যাশার চেয়ে বড়ো ব্যবধানে এগিয়ে থাকার দাবি করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। এই বিজেপি নেতার দাবি, ভবানীপুরের প্রাথমিক প্রবণতা অনুযায়ী তিনি প্রাথমিকভাবে প্রত্যাশার চেয়েও বড়ো ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। অধিকারী বলেন, আমার অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, আমার ১,০০০–১,১০০ ভোটে এগিয়ে থাকার কথা ছিলো। তবে, আমি বর্তমানে তার তিনগুণ ব্যবধানে এগিয়ে আছি।

তবে আনন্দবাজার বলছে, ভবানীপুরে  এখনও এগিয়ে মমতা। ৫৩০০ ভোটে তিনি এগিয়ে আছেন। ১৩ রাউন্ড গণনার শেষে ব্যবধান সাত হাজার থেকে কমে পাঁচ হাজার হয়ে গিয়েছে।

এবারের নির্বাচন ছিলো টানটান উত্তেজনার। বিশেষ করে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর)-এর অধীনে রেকর্ড সংখ্যক ভোটার বাদ পড়ার পর এটিই ছিলো প্রথম নির্বাচন। লড়াইটি ছিল মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বর্তমানে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর। এছাড়া কংগ্রেস-বাম জোট এবং তৃণমূলের বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের নতুন দলও এই রাজনৈতিক সমীকরণে যোগ দিয়েছিলো।

২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল ২১৫টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেছিলো এবং বিজেপি ৭৭টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সেবার নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হলেও পরে ভবানীপুর উপনির্বাচনে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা। তবে এবার শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি মমতার কেন্দ্র ভবানীপুরেই কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, যা এবারের গণনায় আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে।

গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় পশ্চিমবঙ্গে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ফালতাসহ বেশ কিছু বুথে পুনর্নির্বাচনও করতে হয়েছিল কমিশনকে। বুথফেরত জরিপগুলো কোনো দলের স্পষ্ট জয়ের আভাস দিতে না পারলেও, ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল বিজেপির অনুকূলেই যাচ্ছে। ১৫ বছর আগে বাম দুর্গের পতনের পর এবার তৃণমূলের শাসনের অবসান ঘটিয়ে গেরুয়া শিবিরের এই জয়কে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড়ো ধরনের আদর্শিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।