লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে ১০টি ভয়াবহ ভূমিকম্প

স্থানীয় সময় সোমবার সকালে কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কমপক্ষে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছেন। নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলিয়ার্দো দে লা এস্পরিয়েলা শপথ নেয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় এবং গত জুনে প্রতিবেশী ভেনিজুয়েলায় ছয় হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া জোড়া ভূমিকম্পের খবরের পরপরই এই বিপর্যয়টি ঘটে।

ভৌগোলিক গঠনের কারণে লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের নিচে বেশ কিছু জটিল ভূ-টেকটোনিক ফাটল বা ফল্ট লাইন রয়েছে, যার ফলে ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক কিছু ভূমিকম্পের সাক্ষী থেকেছে এই অঞ্চল। ‘ন্যাশনাল সেন্টারস ফর এনভায়রনমেন্টাল ইনফরমেশন’ এবং ‘ওয়ার্ল্ড ডাটা সার্ভিস ফর জিওফিজিক্স সিগনিফিকেন্ট আর্থকোয়েক ডাটাবেস’-এর তথ্যের ভিত্তিতে লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ১০টি ভূমিকম্পের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

ইতিহাসের দ্বিতীয় সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের সাক্ষী হয় হাইতি ছবি: সংগৃহীত
১. ২০১০ সালের হাইতি ভূমিকম্প (মাত্রা ৭.০ । নিহতের সংখ্যা ৩,১৬,০০০)

লাতিন আমেরিকা তো বটেই, ১৫৫৬ সালে চীনের শানসি প্রদেশের ভূমিকম্পের (প্রায় ৮,৩০,০০০০০ মৃত্যু) পর এটি বিশ্ব ইতিহাসের দ্বিতীয় সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্প। কম মাত্রার হলেও শুধু দুর্বল অবকাঠামো, ইট-কনক্রিটের ত্রুটিপূর্ণ ভবন ও ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী পোর্ট-অফ-প্রিন্সে আঘাত হানার কারণে মৃতের সংখ্যা এত বিশাল রূপ নেয়। এতে দেশের প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়, যা ২০০৯ সালে হাইতির মোট জিডিপির প্রায় ১২০ শতাংশের সমান ছিল।

২. ১৮৬৮ সালের ইকুয়েডর-কলম্বিয়া ভূমিকম্প (মাত্রা ৭.৭ । নিহতের সংখ্যা ৭০,০০০)

১৮৬৮ সালের ১৫ আগস্ট রাতে প্রথম একটি মৃদু কম্পনের পরদিন সকালে ৭.৭ মাত্রার এই ক্লাস্টার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এতে ইকুয়েডরে প্রায় ৪০,০০০ এবং কলম্বিয়ায় ৩০,০০০ মানুষ মারা যান। মাত্র তিন সেকেন্ডের প্রবল ঝাকুনিতে ইবারা শহরটি পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং অধিকাংশ মানুষ নিজের শোবার ঘরের ধ্বংসস্তূপের নিচেই জীবন্ত কবর চাপা পড়েন।

সমুদ্র তলদেশের ভূমিকম্পটি ভূখণ্ডের সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া থেকে এক বিশাল হিমবাহ ও পাথরের ধস নামায়, যা পুতে ফেলে দুইটি শহর ছবি: সংগৃহীত
৩. ১৯৭০ সালের পেরু ভূমিকম্প (মাত্রা ৭.৯ । নিহতের সংখ্যা ৬৬,৭৯৪)

সমুদ্র তলদেশের এই ভূমিকম্পটি ভূখণ্ডের সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া থেকে এক বিশাল হিমবাহ ও পাথরের ধস নামায়, যা ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিধস হিসেবে পরিচিত। ঘণ্টায় ৩৩৫ কিলোমিটার গতিতে প্রায় ৮ কোটি ঘনমিটার বরফ ও কাদা নেমে এসে ইউঙ্গায় ও রানরাহিরকা শহরকে ৪ মিটার কাদার নিচে পুতে ফেলে। কেবল ইউঙ্গায় শহরেই মারা যান ১৯,০০০ মানুষ। আর চিমবোতে ও হুয়ারাস শহরের ৭০ শতাংশ এলাকা মাটির সাথে মিশে যায়, যার ফলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন।

৪. ১৭৯৭ সালের ইকুয়েডর ভূমিকম্প (মাত্রা ৮.৩ । নিহতের সংখ্যা ৪০,০০০)

ইকুয়েডরের ইতিহাসে নথিভুক্ত করা সবচেয়ে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কুইটো, রিওবাম্বা, লাতাকুঙ্গা এবং আমবাতো শহরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। মানুষের অনুভূত কম্পনের মাত্রা মাপার 'মডিফাইড মার্সালি স্কেল'-এ এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রা স্পর্শ করেছিল।

১৯৩৯ সালে চিলান (Chillan) শহরের ভূমিকম্পটি ছিল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ছবি: সংগৃহীত
৫. ১৯৩৯ সালের চিলি ভূমিকম্প (মাত্রা ৮.৩ । নিহতের সংখ্যা ৩০,০০০)

চিলিতে ১৯৬০ সালে ৯.৫ মাত্রার সর্বকালের শক্তিশালী ভূমিকম্প হলেও, ১৯৩৯ সালে চিলান শহরের ভূমিকম্পটি ছিল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী। দুর্বল অ্যাডোব (কাঁচা মাটি ও খড়) দিয়ে তৈরি ঘরবাড়ি এবং ভূকম্পন-সহনশীল ইঞ্জিনিয়ারিং নকশার অভাবেই এত বেশি মানুষ মারা যান। এই ঘটনার পরই চিলি প্রথমবারের মতো ভূকম্পন-সহনশীল ভবন নির্মাণ আইন তৈরি করে।

৬. ১৮১২ সালের ভেনিজুয়েলা ভূমিকম্প (মাত্রা ৭.৭ । নিহতের সংখ্যা ২৬,০০০)

গবেষকদের মতে, এটি মূলত পরপর ও কাছাকাছি ঘটে যাওয়া তিনটি ভূমিকম্পের একটি ধারাবাহিক রূপ ছিল। এতে রাজধানী কারাকাসের ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং বার্কিসিমেতো, মেরিডা, লা গুয়াইরা ও সান ফেলিপে শহরে হাজার হাজার মানুষ মারা যান। স্পেনের বিরুদ্ধে ভেনিজুয়েলার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই ঘটনা ঘটায় তৎকালীন স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ একে ‘বিপ্লবীদের ওপর ঐশ্বরিক শাস্তি’ হিসেবে প্রচার করেছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রথম আন্তর্জাতিক সহায়তা হিসেবে ত্রাণ পাঠিয়েছিল।

৭. ১৮৬৮ সালের আরিকা ভূমিকম্প (মাত্রা ৮.৫ । নিহতের সংখ্যা: ২৫,০০০)

তৎকালীন পেরু এবং বর্তমান চিলির অন্তর্ভুক্ত আরিকা শহর কেন্দ্রিক এই ভূমিকম্পে আরিকা, আরেকিপা, মোকুগুয়া, মোলেন্দো এবং ইলো শহর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ভূমিকম্পের প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামি পেরুর বন্দর শহরগুলোকে ধুয়ে মুছে নিয়ে যায় এবং সেই সুনামির ধ্বংসাত্মক ঢেউ বহুদূরের হাওয়াই ও নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

রাজধানী গুয়াতেমালা সিটিতে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে ১ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছবি: সংগৃহীত
৮. ১৯৭৬ সালের গুয়াতেমালা ভূমিকম্প (মাত্রা ৭.৫ । নিহতের সংখ্যা ২৩,০০০)

স্থানীয় সময় ভোররাত তিনটায় ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী গুয়াতেমালা সিটিতে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে ১ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাঁচা ঘরবাড়িগুলো নিমেষেই মাটির সাথে মিশে যায় এবং শক্তিশালী আফটারশকে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ে। দেশটির প্রায় ১২ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন এবং প্রায় ৪০ শতাংশ হাসপাতাল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।৯. ১৭৯৭ সালের ভেনিজুয়েলা ভূমিকম্প (মাত্রা অনির্ধারিত । নিহতের সংখ্যা ১৬,০০০)

বিখ্যাত জার্মান ভূগোল বিশারদ আলেকজান্ডার ভন হুমবোল্ট এই কুমানা শহরের বিপর্যয়টি নথিভুক্ত করেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ভূকম্পনের ঠিক আগে মাটির নিচ থেকে প্রচণ্ড গর্জন ও গন্ধকের গন্ধ বের হয়েছিল এবং মাটির ফাটল দিয়ে আগুনের শিখা ফুটন্ত পানির মতো ফুটে উঠেছিল।

১০. ১৮৬১ সালের আর্জেন্টিনা ভূমিকম্প (মাত্রা আনুমানিক ৭.২ । নিহতের সংখ্যা ১৪,০০০)

মধ্যরাতের কাছাকাছি সময়ে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে মেন্দোজা শহরের সান ফ্রান্সিসকো ব্যাসিলিকাসহ অধিকাংশ স্থাপনা ধসে পড়ে। ভূমিকম্পের পরপরই তখনকার দিনের গ্যাসের বাতিগুলো থেকে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ আগুন ধ্বংসস্তূপ জুড়ে দিনের পর দিন জ্বলতে থাকে, যা পরবর্তীতে ব্যাপক লুটপাটের সুযোগ তৈরি করেছিল।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স