চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া। ৭.৪ মাত্রার এই বিধ্বংসী ভূকম্পনে গুঁড়িয়ে গেছে দেশটির কফি উৎপাদনকারী পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকাগুলো। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া মানুষদের বের করে আনতে মরণপণ উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
মঙ্গলবার পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে ২৫৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তবে নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সোমবার ভোরের দিকে আঘাত হানা এই ভূকম্পনে বহুতল ভবন, আবাসিক ঘরবাড়ি, স্কুল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয় ভেঙে পড়েছে, নয়তো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কফি সমৃদ্ধ অঞ্চল পেরেইরা এবং দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর ক্যালি। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পেরেইরাতেই অন্তত ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে ক্যালি শহরে প্রাণ হারিয়েছেন ৯৫ জন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী চোকো অঞ্চলের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ ও জরুরি পরিষেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় উদ্ধার অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নবাগত প্রেসিডেন্ট আবেলর্দো দে লা এস্প্রিয়েল্লা দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় এই মারাত্মক দুর্যোগের মুখোমুখি হলেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে গৃহহীনদের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার দিনভর ক্রেন, এক্সকাভেটর এবং খালি হাতে মানবশৃঙ্খল তৈরি করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ফাঁকে ফাঁকে চারপাশ নিস্তব্ধ রেখে কান পেতে শোনার চেষ্টা করছেন, কোথাও থেকে কোনো জীবিত মানুষের আর্তনাদ বা সাড়া আসে কি না।
ক্যালি শহরের বিধ্বস্ত ‘তোরেস দেল লিমোনার’ অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তূপ থেকে অলৌকিকভাবে এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হলে উপস্থিত জনতা আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। তবে ক্যালি শহরের মর্গগুলো মরদেহে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। শহরের মেয়র লুটপাট ঠেকাতে রাতে কারফিউ জারি করেছেন।

বাস্তবতার মুখোমুখি প্রত্যক্ষদর্শীরা: পেরেইরা শহরের এক গেস্ট হাউসের মালিক রোসা গঞ্জালেস বলেন, ভবনটি মচমচ শব্দ শুরু করতেই আমরা কোলের শিশুকে নিয়ে বাইরে দৌড়ে বের হই, আর চোখের সামনে পুরো ভবনটি ধসে পড়ে। সামাজিক মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার হোসে গাল্লেগো পেরেইরা বিমানবন্দরে অবতরণের পরপরই ভূমিকম্পের মুখে পড়েন। তিনি জানান, ভয়াবহ কম্পনে ছাদের অংশ খসে পড়ছিল এবং চারদিকে রক্তাক্ত মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। এ পর্যন্ত শতাধিক আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে।

ত্রাণের অপেক্ষায় দুর্গম এলাকা: প্রশান্ত মহাসাগরীয় চোকো অঞ্চলের দুর্গম সিপি এলাকার স্থানীয় নেতা আন্দ্রেস কাইসেদো জানান, সেখানে এখনো কোনো সরকারি সহায়তা পৌঁছায়নি। তিনি বলেন, ইন্টারনেটের একটু সিগন্যাল পাওয়ার জন্য আমাদের গাছে উঠতে হচ্ছে। আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কোনো চিকিৎসাসামগ্রী নেই, নিজেদের হাতেই যতটুকু সম্ভব কাজ করছি।
যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় এবং বহু এলাকা এখনও বিদ্যুৎ ও পানীয় জলহীন অবস্থায় থাকায় পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতি ও চূড়ান্ত প্রাণহানির সংখ্যা নির্ধারণ করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
