পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার ইস্ট নুসা টেঙ্গারা প্রদেশের ফ্লোরেস দ্বীপে আঘাত হানা ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সময় শনিবার ভোরে ভূ-পৃষ্ঠের মাত্র ১৫ কিলোমিটার গভীরে সৃষ্টি হওয়া এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও একশ'র বেশি মানুষ।
রিখটার স্কেলে শক্তিশালী এই কম্পনের পর অন্তত ৩৪১টি আফটারশক (পরবর্তী মৃদু কম্পন) অনুভূত হওয়ায় পুরো অঞ্চল জুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২০২২ সালে পশ্চিম জাভায় শত শত মানুষের প্রাণহানির পর এটিই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্রটিতে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ ভূকম্পন।

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, প্রলয়ঙ্করি এই দুর্যোগে ১ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি বহু স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সরকারি কার্যালয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভূমিকম্পের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে মাঙ্গরাই অঞ্চলে, যেখানে সর্বোচ্চ ২৪ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া ইস্ট মাঙ্গরাইয়ে ১৭ জন, সিক্কায় ৩ জন এবং এনগাদা, এন্দে ও ওয়েস্ট মাঙ্গরাইয়ে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন। প্রদেশের ডেপুটি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বেঞ্জামিন পাউলাস অকটাভিয়ানাস জানান, ৩৬ জন গুরুতর আহতসহ মোট ১১৩ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আটকে পড়াদের উদ্ধারে ইতোমধ্যে ৩,৫০০-এর বেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভূমিধসের কারণে মাউমেরে ও বিভিন্ন দুর্গম পার্বত্য গ্রামের অবরুদ্ধ সড়কগুলো পরিষ্কার করে উদ্ধারকারী দলগুলো পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে চাপা পড়ে থাকায় নিখোঁজের সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি।
ভূমিকম্পের পর সুনামি আতঙ্ক ও ঘরবাড়ি ধসে পড়ার ভয়ে প্রায় ৫,০০০ মানুষ ঘরছাড়া হয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। শুধু সিক্কা ও মাঙ্গরাই এলাকা থেকেই প্রায় ৫,০০০ বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বা তারা নিজেরা স্পোর্টস অ্যারেনাসহ অস্থায়ী তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক পরিবার পলিথিন ও টার্পালিনের তাঁবু টাঙিয়ে খোলা প্রাঙ্গণে রাত কাটাচ্ছেন।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অন্তত ২০টি পেট্রোল পাম্প অকার্যকর হয়ে পড়েছে। মাউমেরে ও রুটেন আঞ্চলিক হাসপাতালের ছাদ ধসে পড়ায় রোগীদের বাইরের তাঁবুতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় ইস্ট নুসা টেঙ্গারা রাজ্য সরকার পুরো প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারির পরিকল্পনা করছে, যাতে দ্রুত অর্থ ও অন্যান্য ত্রাণ সহায়তা বরাদ্দ করা যায়।
উল্লেখ্য, ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অব ফায়ার'-এ অবস্থিত হওয়ায় এটি অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এর আগে ১৯৯২ সালেও একই অঞ্চলে ৭.৫ মাত্রার এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সম্প্রতি সিক্কা ও আশেপাশের উপকূলীয় এলাকায় সাগরের পানি পিছিয়ে যাওয়ায় বাসিন্দাদের পাহাড়ের দিকে ছুটে যেতে দেখা যায়।
তবে প্রাথমিক সুনামি সতর্কতা দেওয়ার তিন ঘণ্টা পর তা প্রত্যাহার করে নেয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে সাধারণ মানুষকে উপকূলীয় এলাকা ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স-বিবিসি
