প্রবল ভূমিকম্পের আঘাতে লণ্ডভণ্ড কলম্বিয়ায় অলৌকিকভাবে বেঁচে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করতে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
সোমবার ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর চার দিন কেটে গেলেও ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে এখনো ভেসে আসছে বেঁচে থাকার আকুতি। চরম স্বজন হারানোর বেদনার মাঝেও উদ্ধারকর্মীরা রাত-দিন এক করে চষে বেড়াচ্ছেন দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ভবনগুলো।
কলম্বিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর ক্যালিতে এক ধসে পড়া আবাসিক ব্লকের নিচ থেকে ভোরে আচমকা কিছু আওয়াজ পান উদ্ধারকর্মীরা। জীবন্ত মানুষ আটকে থাকার সেই আশার বার্তা পেয়ে শত শত স্বেচ্ছাসেবক ও ফায়ার সার্ভিস কর্মী পুনরায় জোরকদমে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করেন।

প্রশাসনের পরিসংখ্যান ও ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র: কলম্বিয়া কর্তৃপক্ষের শুক্রবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত ২৮৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রায় ৪,০০০ মানুষ আহত হয়েছেন। এখনো প্রায় ৪০০ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের খোঁজে চলছে রুদ্ধশ্বাস তল্লাশি।
নিহত ও আহতদের অর্ধেকেরও বেশি ক্যালি এবং পেরেইরা শহরের বাসিন্দা। প্রশান্ত মহাসাগরীয় বন্দর শহর বুয়েনাফেনচুরা থেকে শুরু করে পশ্চিম কলম্বিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হাজার হাজার ঘরবাড়ি, স্কুল ও হাসপাতাল ভেঙে পড়েছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গৃহহীন হাজারো মানুষ আতঙ্কে খোলা আকাশের নিচে বা অস্থায়ী আশ্রয়ে রাত কাটাচ্ছেন।

বিয়ের আগেই ট্র্যাজেডি ও ধ্বংসস্তূপে স্মৃতির সন্ধান: পেরেইরা শহরের একটি ধসে পড়া হোটেলের ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালানোর সময় উঠে আসে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। যে সপ্তাহে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, সেই ২৪ বছর বয়সী যুবক হুয়ান ফেলিপে গিরালদোর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে শুক্রবার। তিনি তাঁর ২ বছরের এক সন্তানকে রেখে গেছেন।
অন্যদিকে, স্বেচ্ছাসেবকরা ধ্বংসস্তূপের মাঝ থেকে খুঁজে বের করছেন মানুষের ছবি, চিঠি ও প্রিয় গয়না—যাতে বেঁচে থাকা বা স্বজনহারা মালিকদের কাছে সেগুলো অন্তত স্মৃতি হিসেবে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। একই সাথে লা লিবার্তাদ পার্কের অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকা শত শত বাস্তুচ্যুত পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

ত্রাণসংকট, নতুন বাস্তুচ্যুতি ও পুনর্গঠন ব্যয়: জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনে জর্জরিত কলম্বিয়ায় এই ভূমিকম্প নতুন মানবিক সংকট ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি তৈরি করেছে। নরওয়েজিয়ান রিফ্যুজি কাউন্সিলের মতে, দেশের প্রায় ৯০ লাখ মানুষ আগে থেকেই মানবিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যার ১০ শতাংশ মানুষই এই দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে বাস করেন।
প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, দেশের বিধ্বস্ত অঞ্চলগুলো পুনর্গঠন করতে কমপক্ষে ২০ ট্রিলিয়ন কলম্বিয়ান পেসো (প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রয়োজন হতে পারে, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশ। ক্যামেরার বিল্ডিং অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, পুরনো ও আধুনিক ভূমিকম্প-সহনীয় নিয়ম না মেনে তৈরি করা ভবনগুলোই বেশি ধসে পড়েছে।

নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্টের প্রথম বড় পরীক্ষা: দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ৭.৪ মাত্রার এই ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছেন কলম্বিয়ার নতুন ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট অ্যাবেলকার্ডো ডি লা এস্প্রিয়েল্লা। প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশি উদ্ধারকারী দল প্রত্যাখ্যান করায় তিনি সমালোচনার মুখে পড়লেও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলসহ বিভিন্ন দেশের বৈষয়িক ও কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করেছে তাঁর সরকার।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র প্রদেশ চোকোর রাজধানী কুইবডো সফরকালে প্রেসিডেন্ট এস্প্রিয়েল্লা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ পুনর্গঠনে সরকার সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
