নেপালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে এক অভাবনীয় ওলটপালট ঘটে গেছে। মাত্র চার বছর আগে গঠিত রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি), যার নেতৃত্বে রয়েছেন র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া বালেন্দ্র শাহ, নেপালের দ্বৈত-নির্বাচন পদ্ধতিতে এমন এক বিজয় ছিনিয়ে এনেছে যা অনেকের কাছেই ছিল অসম্ভব, একটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজাতরা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন এবং সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে বালেন্দ্র শাহর (যিনি নেপালে 'বালেন' নামেই পরিচিত) বিজয়; তিনি ঝাপা-৫ আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলিকে পরাজিত করেছেন, যা দীর্ঘকাল ধরে অলির অজেয় দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল।
নেপালজুড়ে ভ্রমণের সময় আরএসপির উল্লসিত ভোটাররা আমাদের জানিয়েছেন, তারা দশকের পর দশক ধরে চলে আসা দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক স্থবিরতায় ক্লান্ত। ঝাপা-৫ আসনের ভোটার ইস্পা সাপকোটা বিবিসিকে বলেন, বালেন এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আশার প্রতীক।
তবে বাস্তবতা হলো, নেপাল এখন এক অজানা রাজনৈতিক পথে পা বাড়িয়েছে। সরকার পরিচালনার কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকা একটি তরুণ দল এখন দেশের হাল ধরবে, যাদের কাঁধে রয়েছে দ্রুত পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকা এক বিশাল জনগোষ্ঠীর উচ্চাশার ভার। ৩৫ বছর বয়সী বালেনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বলতে শুধু রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে কাটানো তিন বছর।
তা সত্ত্বেও, রাজনীতিতে তাঁর এই নবাগত পরিচয়কেই অনেক ভোটার ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন, এটি নেপালের পুরনো রাজনীতিকদের ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুযোগ। আরএসপি সভাপতি রবি লামিছানে এবং বালেন একটি কংক্রিটের দেয়াল ভেঙে ফেলছেন, এমন একটি ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে তাদের ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে, যার শিরোনাম: ‘আমরা এসে গেছি’।
অবশ্য বালেনের রেকর্ড যে পুরোপুরি নিষ্কণ্টক, তা নয়। মেয়র থাকাকালীন ফুটপাত হকারদের উচ্ছেদ এবং লাইসেন্সবিহীন ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে গিয়ে পুলিশ ব্যবহারের কারণে মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাঁর সমালোচনা করেছিল। তবে বিবিসি এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলে বালেনের প্রচার শিবির থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই উদ্বেগগুলো উত্থাপন করে বলেছে, দ্রুত ফলাফল দেখাতে চাওয়া নতুন নেতাদের মধ্যে এ ধরনের আচরণ প্রায়ই দেখা যায়। সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, আমরা আশা করি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি আইনের শাসনের দিকে বেশি নজর দেবেন।
দুর্নীতি দমনকে আরএসপি তাদের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের সম্পদের তদন্ত করা এবং অবৈধভাবে অর্জিত সম্পত্তি জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। পাশাপাশি তারা বিচার বিভাগ সংস্কার, বিচারক নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিচারিক কার্যক্রমের সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা করছে।
সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ বিপিণ অধিকারী আশাবাদী যে, নেপালের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই সংস্কারে আরএসপিকে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, এতদিন সিভিল সার্ভিস রাজনৈতিক চাপে ছিল। এখন তারা স্বাধীনতা পাবে। আমলারাও বছরের পর বছর ধরে পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিলেন, তারা প্রস্তুত।
আরএসপির অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শিশির খানাল জানান, আমলাতন্ত্রকে চাঙা করতে তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা দ্রুত একটি বিল আনব যা সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ও পদোন্নতি কাঠামোকে ঢেলে সাজাবে এবং কাজের স্পৃহা বাড়াতে প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা তৈরি করবে।
অর্থনীতি আরএসপির জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা। নেপালের তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশ এবং তারা বিশ্বাস করছে আরএসপি অর্থনীতিতে গতি আনবে। দেশটিতে বর্তমানে যুব বেকারত্বের হার প্রায় ২০ শতাংশ এবং প্রায় ৩০ লাখ নেপালি বিদেশে কর্মরত। ইস্পা সাপকোটা সতর্ক করে বলেন, আমাদের এখানে চাকরি নেই, মেধাপাচার এখন দেশের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে কেউ কেউ মনে করছেন আরএসপির লক্ষ্যগুলো অবাস্তব। তাদের ইশতেহারে প্রতি বছর ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আগামী ৫-৭ বছরের মধ্যে নেপালকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। অথচ বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নেপালের প্রবৃদ্ধি হবে ৪.৬ শতাংশ এবং ভবিষ্যতে এটি আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, পর্যটন খাতের মন্দা এবং ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেপালের অর্থনীতির প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
নেপালের সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক নিশ্চল এন পান্ডে মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নেপালের অর্থনীতির জন্য এক তাৎক্ষণিক হুমকি। নেপালের জিডিপির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি আসে রেমিট্যান্স থেকে, যার বড় অংশই পাঠান মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকরা। তিনি বলেন, "সেখানে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়লে আমরা বড় সংকটে পড়ব।"
তবে আরএসপি নেতা শিশির খানাল মনে করেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে পারলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তিনি বলেন, প্রায় দুই ডজন আইন বাতিল বা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। বর্তমানে একটি কোম্পানি নিবন্ধন করতেই অনেক দপ্তরে ঘুরতে হয়; আমরা দ্রুত এসব বাধা দূর করব।"
সব মিলিয়ে সংস্কারের এই পথটি নতুন সরকারের জন্য বেশ কণ্টকাকীর্ণ। বিপুল বিজয় সত্ত্বেও বালেন এবং আরএসপি নেতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে সংসদ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ রাখা। এর আগে ছোট শরিক হিসেবে অল্প সময়ের জন্য সরকারে থাকলেও, মূলত তারা একটি আন্দোলনকারী শক্তি হিসেবেই পরিচিত, শাসক দল হিসেবে নয়। বিপিণ অধিকারী মনে করেন, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, "তারা বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে এসেছেন এবং রাষ্ট্রপরিচালনায় অভিজ্ঞ নন। ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।"
এছাড়া বিরোধী দল দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। শক্তিশালী বিরোধী দল এবং স্বাধীন গণমাধ্যম না থাকলে সরকার স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারে এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সবশেষে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষা। ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত হিন্দু-প্রধান দেশ নেপালে ভারতের প্রভাব ঐতিহাসিকভাবেই প্রবল। ইতোমধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টেলিফোনে বালেন ও লামিছানেকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলিকে চীনের ঘনিষ্ঠ মনে করা হলেও, বিশ্লেষকদের মতে তিনি মূলত 'নিরপেক্ষ' নীতিই বজায় রেখেছিলেন।
আরএসপি মুখপাত্র শিশির খানাল স্পষ্ট করেছেন, নেপালের কূটনৈতিক নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই এবং সংবিধান অনুযায়ী তারা কোনো সামরিক জোটে জড়াবে না। তবে চীনের প্রভাবের ওপর কড়া নজর রাখা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও নেপালের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। খানাল স্বীকার করেছেন, আমেরিকার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকলেও তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে প্রতিবেশী দেশগুলোই।
নতুন মুখ নিয়ে গঠিত এই তরুণ দলের সামনে এখন অনেক কাজ। নেপালের জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম পরিবর্তনের জন্য তৃষ্ণার্ত। তারা এখন নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন এবং শাসককে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে প্রস্তুত। বালেন এবং আরএসপিকে এই নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই নেপালের জন্য এক অজানার পথে যাত্রা শুরু করতে হবে।