অভ্যুত্থান ও গুপ্তহত্যার আতঙ্কে ক্রেমলিনে কোণঠাসা পুতিন!

রাশিয়ার প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করেছে। বিশেষ তরে ক্রেমলিনে গড়ে তোলা হয়েছে নিখুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শীর্ষস্থানীয় রুশ সামরিক কর্মকর্তাদের একের পর এক গুপ্তহত্যা এবং সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় পুতিনের ঘনিষ্ঠ কর্মীদের বাড়িতেও নজরদারি ব্যবস্থা বসানো হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর হাতে আসা একটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য। এতে বলা হয়েছে, পুতিন ইনাদিং জনসম্মুখেও আসছেন না।

Putin in Danger 1
ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার নথিতে বলা হয়েছে, ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে কাজ করা বাবুর্চি, দেহরক্ষী এবং ফটোগ্রাফারদের গণপরিবহন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্রেমলিন প্রধানের সাথে দেখা করতে আসা দর্শকদের এখন থেকে দু’বার স্ক্রিনিং করা হয়। এমনকি পুতিনের খুব কাছাকাছি কাজ করেন এমন কর্মীরা শুধু ইন্টারনেটবিহীন ফোন ব্যবহারের অনুমতি পাচ্ছেন।

Putin in Danger 2
নিরাপত্তার নতুন কড়াকড়ি ও ভলদাই ত্যাগ:
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক শীর্ষ জেনারেলের হত্যার পর রুশ নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়, যা এই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে একের পর এক বিপত্তি, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট এবং ক্রমবর্ধিত জনরোষ পুতিনকে চূড়ান্ত অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

প্রিয় অবকাশ কেন্দ্র ভলদাইতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন পুতিন ছবি: সংগৃহীত
রিপোর্ট অনুযায়ী, পুতিন বর্তমানে তাঁর নিয়মিত সফর করা জায়গার সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি এবং তাঁর পরিবার মস্কোর আশপাশের এলাকা এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত প্রিয় অবকাশ কেন্দ্র ‘ভলদাই’-তে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছেন। চলতি বছর তিনি এখনও কোনো সামরিক স্থাপনা পরিদর্শনে যাননি। পরিবর্তে, ক্রেমলিন তাঁর আগে থেকে রেকর্ড করা ছবি ও ভিডিও জনসমক্ষে প্রচার করছে যাতে তাঁর সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে পুতিন কৃষ্ণ সাগরের উপকূলীয় অঞ্চল ক্রাসনোডারের উন্নত বাঙ্কারেও দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছেন।

নিরাপত্তা পরিষদের সচিব সের্গেই শোইগুর অভ্যুত্থান আশঙ্কার সাথে জড়িয়েছে ছবি: সংগৃহীত
অভ্যুত্থানের ঝুঁকি ও সের্গেই শোইগুর ভূমিকা:
২০২৬ সালের মার্চের শুরু থেকেই পুতিন স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁস এবং তাঁকে লক্ষ্য করে কোনো ড্রোন হামলা বা অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, এক সময়ের পুতিন-ঘনিষ্ঠ এবং বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের সচিব সের্গেই শোইগুর নাম এই অভ্যুত্থান-আশঙ্কার সাথে জড়িয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনীর উচ্চস্তরে শোইগুর ব্যাপক প্রভাব পুতিনের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৫ মার্চ শোইগুর প্রাক্তন ডেপুটি রুসলান সালিকোভের গ্রেফতার মূলত এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে দুর্বল করার একটি কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফানিল সারভারোভের হত্যা করা হয় ছবি: সংগৃহীত
মস্কোর অভিজাত শ্রেণির ক্ষোভ:
ইউক্রেন যুদ্ধে প্রতি মাসে রাশিয়ার প্রায় ৩০ হাজার সেনা হতাহত হচ্ছে। ড্রোনের মাধ্যমে মস্কোর অভিজাত পাড়াগুলোতেও ইউক্রেনীয় হামলা শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত সেলফোন ও ইন্টারনেট পরিষেবা বিভ্রাট মস্কোর ধনাঢ্য শ্রেণির মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এতদিন যুদ্ধের আঁচ শহরতলিতে পৌঁছালেও এখন তা সরাসরি রাশিয়ার শহুরে উচ্চবিত্তদের জনজীবনে প্রভাব ফেলছে।

ক্রেমলিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল: গত বছরের ডিসেম্বরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফানিল সারভারোভের হত্যার পর পুতিনের উপস্থিতিতে একটি উত্তপ্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি’র প্রধান আলেকজান্ডার বোর্তনিকোভকে কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য কঠোর সমালোচনা করেন। এই বিবাদ মেটাতে পুতিন তাঁর নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাহিনী এফএসও (FSO)-এর আওতা বাড়িয়ে আরও ১০ জন শীর্ষ কমান্ডারের সুরক্ষার দায়িত্ব দেন।

ক্রেমলিনের ১০ জন শীর্ষ কমান্ডারের সুরক্ষা বৃদ্ধি করা হয়েছে ছবি: সংগৃহীত
বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে পরিবর্তন:
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এবারের ৯ই মে-র রেড স্কয়ার কুচকাওয়াজ থেকেও ভারী অস্ত্রশস্ত্র এবং মিসাইল বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ক্রেমলিন। মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, 'সন্ত্রাসী হুমকি' মোকাবিলা করতেই এই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে, রাশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং পুতিনের চরম নিরাপত্তাহীনতা হয়তো ক্রেমলিনের ভেতরে এক বড় ধরনের ধসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও এই তথ্যের অনেক কিছুই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা কঠিন, তবে ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর পর পুতিনের ঘিরে তৈরি হওয়া এই অস্বাভাবিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তাঁর চরম রাজনৈতিক অস্থিরতারই পরিচয় দিচ্ছে।