দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে তাণ্ডব চালানো ভয়াবহ দাবানল এখন এতটাই মারমুখী রূপ নিয়েছে যে তা বায়ুমণ্ডলে নিজের আবহাওয়া নিজেই তৈরি করছে! পরিবেশ ও অগ্নিনির্বাপক কর্তৃপক্ষের মতে, তীব্র আগুনের তাপে তৈরি হওয়া এই বিশেষ মেঘ ফরাসিদের জন্য একেবারেই নজিরবিহীন এক অভিজ্ঞতা।
বিজ্ঞানীদের ভাষায় এই মেঘকে বলা হয় ‘পাইরোকিউমুলোনিমবাস’ বা সংক্ষেপে ‘পাইরো-সিবি’, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘ফায়ার ক্লাউড’ বা ‘অগ্নি মেঘ’ নামে পরিচিত। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এই ধরনের মেঘকে ‘মেঘের আগুনে ড্রাগন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
কীভাবে তৈরি হয় এই ‘ফায়ার ক্লাউড’?
যখন কোনো বিশাল বনভূমিতে অস্বাভাবিক মাত্রায় প্রচণ্ড দাবানল সৃষ্টি হয়, তখন আগুনের সেই তীব্র তাপ ধোঁয়ার কুণ্ডলীসহ বায়ুমণ্ডলের ওপরের দিকে হু হু করে উঠতে থাকে। বাতাস যত ওপরের শীতল বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তত তা ঘনীভূত হয়ে বিশালাকার বজ্রমেঘের রূপ নেয়। এই মেঘ বায়ুমণ্ডলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার ওপরের ‘স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার’ স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।
কেন এই ফায়ার ক্লাউড অত্যন্ত বিপজ্জনক?
এই অগ্নিমেঘ মোটেও সাধারণ মেঘের মতো নয়। এটি আগুনের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এটি মেঘের ভেতর থেকেই শক্তিশালী বাতাস ও প্রচণ্ড গতিসম্পন্ন ঘূর্ণিবায়ু (টর্নেডো) তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে মেঘ থেকে তৈরি হওয়া বাজ বা বজ্রপাত অনেক দূরে গিয়ে নতুন করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
এই মেঘের কারণে ভূ-পৃষ্ঠে আগুনের গতিপথ ঘন ঘন বদলে যায়, যা মাটিতে থাকা অগ্নির্বাপক কর্মীদের জন্য মারাত্মক জীবনঝুঁকি তৈরি করে।
জিরোন্দ অঞ্চলের ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ প্রধান মার্ক ভার্মিউলেন রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেছেন যে, এমন পরিবেশগত ঘটনা ফ্রান্সে আগে কখনো দেখা যায়নি। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের দাবানল গবেষক প্রফেসর রিক ম্যাক্রে বলেন, এটি নিশ্চিত করে যে এই আগুন কতটা ধ্বংসাত্মক এবং কেন বহু মানুষকে এলাকা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আগুন নেভাতে লেগে যেতে পারে কয়েক মাস!
ফরাসি অগ্নিনির্বাপক সংস্থার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডেভিড অ্যানোটেল এক রেডিওকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছেন। তিনি জানান, এই দাবানল পুরোপুরি নেভাতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। ২০২২ সালে এই অঞ্চলে হওয়া একটি তুলনামূলক ছোট দাবানল নেভাতেই কয়েক মাস সময় লেগেছিল।
চলতি সপ্তাহে তাপমাত্রা আবারও ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কায় একটি নতুন তাপদাহ ফ্রান্সের দিকে ধেয়ে আসছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই তীব্র খরা ও তাপদাহ তৈরি হচ্ছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের ভয়াবহ ‘ফায়ার ক্লাউড’ তৈরির প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন-দ্য গার্ডিয়ান