যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও পারস্য উপসাগরে নৌ-অবরোধের তোয়াক্কা না করে ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের অস্ত্র উপাদান, বিস্ফোরক ও সামরিক যানবাহন আমদানির এক বিশাল ও গোপন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে ইরান। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এবং ইসরাইলি-আমেরিকান ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘২৪০ অ্যানালিটিক্স’-এর এক যৌথ অনুসন্ধানে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ইরান অন্তত ৫ হাজার সামরিক সংস্থাকে এই সরবরাহ শৃঙ্খলে কাজে লাগিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামের শুরুতে ‘এমওডি’ এবং পরে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার কোড ব্যবহার করা হয়। রয়টার্স বলছে, এসব প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে সংঘাতের মধ্যেও ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিশাল ভান্ডার নিরবচ্ছিন্নভাবে পুনর্বাসিত করতে সক্ষম হয়েছে।
যেভাবে কাজ করে এই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক: তদন্তে দেখা যায়, এই শৃঙ্খলটি ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের মালিকানাধীন ‘বনিয়াদ’ সমবায় কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচার ও আমদানির জন্য ব্যবহৃত ট্রাস্টি এবং ভুয়া (শেল) কোম্পানি তেল বিক্রির অর্থ ব্যবহার করে এই সামরিক কেনাকাটা চালায়।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, রয়টার্সের পর্যালোচিত ৯৭ শতাংশ চালানেই আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঝামেলা এড়াতে অর্থ ছাড়াই লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক নজরদারি এড়ানো ইরানের পক্ষে সহজ হয়েছে। এসব আমদানির উৎস হিসেবে দেখা গেছে চীন, রাশিয়া এবং জার্মানির মতো দেশকে।
সবচেয়ে বড় ক্রেতা ও ভয়াবহ বিস্ফোরণ: এই নেটওয়ার্কের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ‘এমওডি ৩৪৬৪২৮’ নামের একটি সংস্থা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই একটি সংস্থাই ২.৩ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে। এর মধ্যে সলিড রকেট ফুয়েলের কাঁচামাল হিসেবে চীন থেকে শত শত টন সোডিয়াম ক্লোরেট ও পারক্লোরেট কেমিক্যাল আমদানি করা হয়।
রয়টার্সের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহীদ রাজাই বন্দরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণের নেপথ্যে ছিল এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আনা সোডিয়াম পারক্লোরেটের চালান। সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ৭০ জন নিহত এবং ১২০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন।
যুদ্ধের মধ্যেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ: ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পরও এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম স্তিমিত হয়নি। সংঘাত শুরুর ঠিক আগের দিনগুলোতেও চীন থেকে ৯৩ টন টাইটানিয়াম (যা রকেটের বডি ও ফিউজলেজে ব্যবহৃত হয়) এবং শত শত টন নাইট্রোসেলুলোজ আমদানি হয়। এছাড়া জুনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ শিথিল হওয়ার পরপরই নতুন চালানে কেমিক্যাল ও সামরিক উপাদান ইরানে পৌঁছায়।
ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের সাবেক কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকি এই নেটওয়ার্ককে ইরানি সামরিক বাহিনীর জীবনরেখা হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তেহরান তাদের সামরিক বাণিজ্যের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ইকো-সিস্টেম তৈরি করে নিয়েছে।