যুদ্ধের ভয়াবহতা কেবল গুঁড়িয়ে যাওয়া ভবন কিংবা প্রাণহানির শুষ্ক পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে না; যুদ্ধের নির্মমতায় হারিয়ে যায় মানুষের একেকটি পরিবার, অফুরন্ত ভালোবাসা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বেঁচে থাকার সব স্বপ্ন। তেমনই এক করুণ ও হৃদয়বিদারক ঘটনার করুণ সাক্ষী ইরানের রাজধানী তেহরানের তরুণ হামেদ মির্জাই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হামেদ মির্জাই এক নিমিষেই হারিয়েছেন তাঁর পরিবারের ১২ জন সদস্যকে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তাঁর ২৬ বছর বয়সী স্ত্রী মোহাদ্দেসেহ। বিয়ের বয়স তখনো এক বছর পূর্ণ হয়নি, কেবল সন্তান নিয়ে নতুন এক স্বপ্নের সংসার সাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এই তরুণ দম্পতি। কিন্তু একটিমাত্র ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাতক আঘাত মুহূর্তে নিঃশেষ করে দেয় তাঁদের সব স্বপ্ন ও জীবন।
আন্তর্জাতিক কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় প্রকাশিত নিজের স্মৃতিচারণমূলক এক আবেগময় লেখায় হামেদ জানান, ২০২৬ সালের ৯ মার্চ তাদের পারিবারিক আবাসন ভবনে সংঘটিত সেই হামলাই তাঁর জীবনকে চিরতরে অন্ধকার করে দিয়েছে।
হামেদ লিখেছেন, হামলার পর আজ সাতটি মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো প্রতিদিন চোখ খুললে মনে হয়, আমি যেন সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছি। সেখান আজও পাগলের মতো খুঁজে বেড়াই আমার প্রিয়জনদের।
হামলার সেই অভিশপ্ত দুপুর: হামেদ জানান, পারিবারিক যৌথতার স্মারক হিসেবে তাঁর দাদা ও বাবার চাচা মিলে বহুতল ওই ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে যার যার অ্যাপার্টমেন্টে সবাই বসবাস করতেন। বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে সেই ভবনেরই একটি ফ্ল্যাটে নতুন জীবন শুরু করেন হামেদ।

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ৯ মার্চ ছিল এক সাধারণ সোমবার। দুপুর ১টার দিকে কাজের সূত্রে তিনি বাড়ির বাইরে যান। দুপুর আড়াইটার দিকে তাঁর স্ত্রী মোহাদ্দেসেহ ফোনে মেসেজ পাঠিয়ে ফেরার সময় মাথাব্যথার ওষুধ কিনে আনতে বলেন। স্ত্রী ও বাড়িতে আসতে চাওয়া অতিথিদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে করতেই হাঁটছিলেন হামেদ।
‘আমি তখন বাসা থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে। হঠাৎ আকাশে এক বিকট শিস দেওয়ার মতো শব্দ শুনলাম। চোখের সামনে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি গিয়ে আছড়ে পড়ল আমাদের বাড়ির ওপর। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠল’।
হামেদ দ্রুত হাতে থাকা ফোন দিয়ে স্ত্রীকে ফের কল করেন, কিন্তু সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর একে একে দাদা, বাবা ও মায়ের নম্বরে কল দিলেও আর কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। দৌড়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে হামেদ দেখেন, শৈশবের স্মৃতিঘেরা প্রিয় বাড়িটি ধুলো আর কংক্রিটের এক বিরাট ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া এক নিঃসঙ্গ জীবন: এক মুহূর্তের হামলায় জীবনসঙ্গিনীসহ পরিবারের ১২ সদস্যকে হারিয়ে আজ পুরোপুরি একাকী হামেদ মির্জাই। সেই ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এখন কেবলই স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন। নিঃস্ব হামেদের আকুল উক্তি, আমার পুরো জীবনটা আজও সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। বিশ্বরাজনীতি ও সামরিক সংঘাতের খেসারত দিতে গিয়ে কীভাবে একেকটি সাধারণ মানুষের সাজানো জীবন চুরমার হয়ে যায়, তেহরানের হামেদ মির্জাইয়ের এই গল্প যেন সারা বিশ্বের কাছে সেই নির্মমতারই এক জীবন্ত স্মারক।
