নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে আরও একধাপ এগিয়ে গেলেন র্যাপার বলেন্দ্র শাহ। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে তার নিজের সংসদীয় আসনেই বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছেন তিনি। এতে করে দেশটির তরুণ প্রজন্মের পছন্দের নেতাই কাঠমান্ডু গদিতে বসতে যাচ্ছেন।
নেপালের নির্বাচন কমিশন শনিবার নিশ্চিত করেছে, ৩৫ বছর বয়সী শাহ ৬৮,৩৪৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে ওলি পেয়েছেন মাত্র ১৮,৭৩৪ ভোট। গত সেপ্টেম্বরে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া রক্তক্ষয়ী গণবিক্ষোভে সরকার পতনের পর এটিই ছিল দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে একদিকে ছিল প্রথাগত রাজনৈতিক শক্তি, আর অন্যদিকে ছিল পরিবর্তনের নেশায় বুঁদ জেন-জি ভোটারদের প্রতিনিধিত্বকারী নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকরা।
নির্বাচন কমিশনের আংশিক ফলাফল অনুযায়ী, বলেন্দ্র শাহর দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) এখন জয়ের পথে রয়েছে। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত আসনগুলোর মধ্যে এই দলই এখন পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এমনকি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভোটেও ৩৫ বছর বয়সী এই তরুণ তুর্কি এগিয়ে আছেন। সরকারি প্রবণতা বলছে, তিনি হয়তো নিরঙ্কুশ জয়ের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছেন।
বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নেপালের রাজনীতি মূলত তিনটি প্রধান দলের জোট সরকারের গোলকধাঁধায় আটকে ছিল, যার মধ্যে দুটি ছিল কমিউনিস্ট দল। এবারের নির্বাচনটি ছিল একটি বড় পরীক্ষা, জেন-জি ভোটাররা কি বাকি দেশবাসীকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, এবার হাল ধরার দায়িত্ব এক অনভিজ্ঞ কিন্তু নতুন প্রজন্মের হাতে দেওয়া উচিত?
নাকি কয়েক দশক ধরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা ঝানু রাজনীতিকরাই টিকে থাকবেন? দেশটির এবারের নির্বাচনে ৮ লাখ নতুন তরুণ ভোটার ছিল, যারা ফলাফল নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করেছে।
জনপ্রিয়ভাবে ‘বালেন’ নামে পরিচিত বলেন্দ্র শাহ নেপালি হিপ-হপ জগতের এক পরিচিত মুখ। নেপালি ভাষায় গাওয়া তার আত্মত্যাগের গান ‘বলিদান’ ইউটিউবে কয়েক মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওলি সরকার সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করলে দেশজুড়ে ‘জেন-জি বিক্ষোভ’ ফেটে পড়ে।
বিক্ষোভকারীরা নেপালের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং রাজনীতিকদের সন্তান বা ‘নেপো কিডদের’ মাধ্যমে সৃষ্ট শ্রেণি বৈষম্যের কঠোর সমালোচনা করেন। সেই বিক্ষোভে মোট ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিবিসির এক তদন্তে উন্মোচিত হয়েছে, দেশটির পুলিশ প্রধান তখন নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বলেন্দ্র শাহ শুরু থেকেই বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়েছিলেন এবং এক পর্যায়ে ওলিকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন,তিনি দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। সাধারণত সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে চললেও নির্বাচনী প্রচারে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন্দ্র জানিয়েছিলেন, তিনি হবেন ‘পুরো নেপালের প্রার্থী’।
গত ফেব্রুয়ারিতে আরএসপি তাদের ইশতেহার প্রকাশ করে, যেখানে ১২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাধ্যতামলূক অভিবাসন কমানোর অঙ্গীকার করা হয়। বেকারত্ব এবং নিম্ন মজুরির কারণে লাখ লাখ নেপালি নাগরিক বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হওয়ায় যে জনরোষ তৈরি হয়েছিল, সেটিকে কাজে লাগাতে চেয়েছে তার দল। এছাড়া পাঁচ বছরের মধ্যে নেপালের মাথাপিছু আয় ১,৪৪৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩,০০০ ডলারে উন্নীত করা, জিডিপি ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যবিমার মতো সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি।
তথ্যসূত্র: বিবিসি