রাজধানীসহ দেশের ফার্মেসিগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হয়ে আসছে মুড়ি মুড়কির মতো। আইইডিসিআরের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণে বিভিন্ন রোগের জীবাণু এখন ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে পড়েছে। ফলে বেশ কিছু রোগের ক্ষেত্রে এটি আর কোনো কাজ করছে না। যার ফলে ঘটছে রোগীর মৃত্যুও। তাই এর অপব্যবহার রোধে কড়াকড়ি আরোপ করলো সরকার।
রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি করলে ২০ হাজার টাকার জরিমানার বিধান রেখে ‘ঔষধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
সোমবার (৬ জানুয়ারি) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে খসড়া আইনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ খবর জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন।
তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এখন আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি মনিটর করার জন্য, যাতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কন্ট্রোল করা যায় সেজন্য ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধ থাকবে। এগুলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে বর্তমানে আমাদের দুটি আইন আছে। একটি হলো ড্রাগস অ্যাক্ট, ১৯৪০ আরেকটি হলো ড্রাগস কন্ট্রোল অর্ডিন্যান্স ১৯৮২। এ দুটোকে এক করে এবং এর সঙ্গে আরও নতুন কিছু যুক্ত করে। এর আগে খসড়া আইনটি ২০২২ সালের ১১ আগস্ট নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেটি আজ চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে আজ অনুমোদনের ক্ষেত্রে একটু পরিবর্তন এসেছে। আগের আইনগুলোতে শুধুমাত্র ওষুধকে ফোকাস করা হয়েছিল, নতুন খসড়ায় কসমেটিকসকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: অধিক জনশক্তি আমদানির আশ্বাস সৌদি রাষ্ট্রদূতের
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ আইনে কসমেটিকসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কসমেটিকসের উৎপাদন, বিতরণ ও স্টোর—এগুলো আমাদের রেগুলেট করা হবে। আমাদের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর যেটা আছে সেটা কন্টিনিউ করবে ও তাদের দায়িত্ব-পরিধি এখানে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এখানে শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। আইনে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয় সে ব্যাপারে খুব জোর দেওয়া হয়েছে। আইনটিতে এ গাইডলাইন প্রতিপালন করা বাধ্যতামূলক করা হবে।
খসড়া আইনে শাস্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ৩০টি অপরাধ চিহ্নিত করা হয়েছে ও এসব অপরাধে শাস্তির কথা উল্লেখ করা আছে। অসৎ উদ্দেশে ওষুধের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করলে শাস্তি যাবজ্জীবন পর্যন্ত। নকল ওষুধ উৎপাদন বা জ্ঞাতসারে কোনো নকল ওষুধ বিক্রি, মজুত, বিতরণ বা বিক্রির উদ্দেশে প্রদর্শন করলে সেখানেও যাবজ্জীবনের প্রভিশন রাখা হয়েছে। ওষুধে ভেজাল করলে বা কোনো ভেজাল ওষুধ উৎপাদন, বিক্রয়, মজুদ, বিতরণ করলে যাবজ্জীবনের প্রভিশন রাখা হয়েছে।
মাহবুব হোসেন বলেন, ওভার দ্য কাউন্টার ওষুধের ক্ষেত্রে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো ওষুধ বিক্রি করলে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কোনটি ওভার দ্য কাউন্টার বিক্রি করা যাবে সেটা বলা আছে (খসড়া আইনে)।
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর লাইসেন্স অথরিটি হিসেবে কাজ করবে। কসমেটিকস উৎপাদন করতে হলে তাদের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। এছাড়া কিছু ওষুধের দাম সরকার ঠিক করে দেবে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
এর আগে গত বছরের ৩০ নভেম্বর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহম্মদ ইউসুফ বলেছিলেন, খোদ রাজধানীতেই মুড়ি মুড়কির মতো দেদারে বিক্রি হচ্ছে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক। এই পরিস্থিতিতে ওষুধটির ব্যবহার সংক্রান্ত একটি নীতিমালা করা হয়েছে। এই নীতিমালা মতে এখন থেকে সিগারেটের প্যাকেটের মতো অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের মোড়কেও থাকবে স্বাস্থ্য সতর্কতা। আবার কোর্স কমপ্লিট ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রিতে থাকবে নিষেধাজ্ঞা।
সেদিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, পৃথিবীর কোথাও স্বীকৃত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হয়না। কিন্তু এর যথেচ্ছ ব্যবহারে তৈরি হয়েছে নানা জটিলতা।
একই সঙ্গে সেদিন মানহীন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করায় ২৭টি ফার্মেসির লাইসেন্স বাতিল করার কথাও জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
একাত্তর/এসি