বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম। দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সবশেষ সূচকে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গত বছরে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৯তম। গত ১৩ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম স্কোর অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) বৈশ্বিক ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৪ প্রকাশ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
১৯৯৫ সাল থেকেই দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রকাশ করে আসছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল- টিআই। এরই ধারাবাহিকতায় দুই হাজার চব্বিশ সালের দুর্নীতির ধারণা সূচক বা সিপিআই প্রকাশে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ধানমন্ডি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ শাখা- টিআইবি।
এ সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান জানান, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ১৪তম, পূববর্তী বছরে ছিলো দশম। দুই ধাপ অবনতি হয়ে বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫১তম। বাংলাদেশের সাথে যৌথ অবস্থানে আছে কঙ্গো ও ইরান। আর আফগানিস্তানের পরেই আছে বাংলাদেশ। গত ১৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের এই স্কোর সর্বনিম্নে।
২০২৪ সালের দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১০০ এর মধ্যে ২৩। আগের বছরের চেয়ে যা এক পয়েন্ট কম, আর গেল ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সিপিআই অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের স্কোর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের পরেই। আফগানিস্তানের স্কোর ১৭।
২০১২ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সিপিআইয়ে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৫ থেকে ২৮। কিন্তু ২০২৩ সালে এটি কমে গিয়ে ২৪-এ দাঁড়ায়। ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সিপিআই ট্রেন্ড বিশ্লেষণ অনুসারে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সিপিআই স্কোর ২৩, গেলে ১৩ বছরের গড় স্কোরের চেয়ে যা তিন পয়েন্ট কম।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা গভীর উদ্বেগজনক। আর এ বছর স্কোর ও উচ্চক্রম অনুযায়ী অবস্থানের অবনমন হয়ে প্রমাণ করে যে গত ১৩ বছর কর্তৃত্ববাদী সরকার মুখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেও বাস্তবে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে, লালন করেছে, এমনকি দুর্নীতি সংঘটনে সহায়তা ও অংশগ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকার মুখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেও বাস্তবে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে, লালন করেছে। এমনকি দুর্নীতি সংঘটনে সহায়তা ও অংশগ্রহণ করেছে। এর প্রভাবে যথেচ্ছ লুটপাট, দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্রীয়ভাবে তোষণ, আইনের সঠিক প্রয়োগ না করা এবং সার্বিক কাঠামোগত দুর্বলতায় বাংলাদেশের অবস্থানের ক্রমাবনতি হয়েছে।
ইফেতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতিবিরোধী বাগাড়ম্বর ব্যতীত এ নিয়ে পতিত আওয়ামী সরকারের কোনো বিকার বা চিন্তা দেখা যায়নি। এমনকি দুর্নীতি দমনে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) অন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি প্রকল্পে কেনাকাটায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অথচ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দুদকসহ দুর্নীতি প্রতিরোধে সৃষ্ট সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তায় অর্থপাচার ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে।
গেল বছরের তুলনায় এ বছর ৫৬টি দেশে সিপিআই স্কোর বেড়েছে। ৯৩টি দেশের স্কোর কমেছে, আর ৩১টি দেশের অবস্থা অপরিবর্তিত। স্কোরের মাত্রায় কোনো দেশই নিখুঁত স্কোর অর্জন করতে পারেনি। এ বছরে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ দেশের স্কোর পঞ্চাশের নিচে।
২০২৪ সালে ৯০ স্কোর নিয়ে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের মর্যাদা পেয়েছে ডেনমার্ক। এরপর ৮৮ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ফিনল্যান্ড, আর ৮৪টি নিয়ে তৃতীয় সিঙ্গাপুর। চলতি বছরে দুর্নীতির শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ সুদান, তাদের স্কোর ৮। সোমালিয়া এরপরেই, স্কোর ৯।
আর ১০ স্কোর নিয়ে দুর্নীতিতে তৃতীয় দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা। দুর্নীতির ধারণা সূচকে (সিপিআই) পাকিস্তানের অবনতি হয়েছে। ১৮০টি দেশের মধ্যে ২০২৩ সালে দেশটির অবস্থান ছিল ১৩৩তম, চলতি বছরে সেটা ১৩৫তম। দুর্নীতির ধারণা শূন্য থেকে ১০০ টিআই সূচক দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
যে দেশটির স্কোর থাকবে শূন্য, সেটি বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যারা ১০০-তে থাকবে, তাদেরকে বলা হবে সবচেয়ে বেশি সুশাসিত।