৩ আগস্ট ২০২৪। ঢাকার শহীদ মিনারের সেই মুহূর্তটি বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। মাত্র ২৬ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র নাহিদ ইসলাম যখন দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, হাসিনাকে যেতেই হবে, তখন সেটি শুধু একটি স্লোগান ছিল না, বরং তা ছিল একটি পুরো প্রজন্মের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সেই গণঅভ্যুত্থানের মাসখানেক পর ২৭ বছর বয়সী নাহিদ নির্বাচনী মাঠে দাঁড়িয়েছেন এক নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে। বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে তিনি লড়ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রধান হিসেবে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া ছাত্র বিদ্রোহ যখন শেখ হাসিনার পতন ঘটায়, তখন নাহিদ ইসলাম হয়ে ওঠেন সেই বিপ্লবের অন্যতম মুখ। অন্তর্বর্তী সরকারে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি গঠন করেন ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’। দলটির লক্ষ্য ছিল, পুরনো পারিবারিক ও রাজবংশীয় রাজনীতির বাইরে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করা।
নাহিদের এনসিপি বর্তমানে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে নির্বাচনে লড়ছে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই ভাঙন ধরেছে। এনসিপির উদারপন্থী ও নারী নেতাদের বড় অংশ দল ত্যাগ করেছেন। তাদের মতে, জামায়াতের মতো দলের সঙ্গে জোট করা এনসিপির মূল চেতনার পরিপন্থী।
তবে নাহিদ ইসলাম এই সিদ্ধান্তকে শুধু একটি ‘নির্বাচনী কৌশল’ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, একটি নতুন দল হিসেবে ৩০০ আসনে লড়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি তাদের নেই। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, এটি আদর্শিক নয়, বরং নির্বাচনী জোট। সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার মতো সাধারণ ইস্যুতে আমরা একমত। ৩০০ আসনের মধ্যে এনসিপি লড়ছে ৩০টিতে, যেখানে জামায়াত লড়ছে ২২২টি আসনে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এবারের লড়াই হতে যাচ্ছে মূল দুটি ব্লকের মধ্যে- একদিকে বিএনপি এবং অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোট। সাম্প্রতিক কিছু জরিপের তথ্য নিচে দেয়া হলো।
আইআরআই জরিপ: ডিসেম্বরের শুরুতে করা এই জরিপে দেখা গেছে বিএনপির প্রতি সমর্থন ৩৩%, জামায়াতের ২৯% এবং এনসিপির ৬%।
প্রজেকশন বিডি ও আইআইএলডি জরিপ: এই যৌথ জরিপে বিএনপিকে ৩৪.৭% এবং জামায়াতকে ৩৩.৬% জনসমর্থন দেয়া হয়েছে, যা একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেয়।
নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ (বাড্ডা-ভাটারা-রামপুরা) আসন থেকে সংসদ সদস্য পদে লড়ছেন। এটি তার জন্মস্থান এবং আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলেও লড়াইটা সহজ নয়। তার বিপরীতে রয়েছেন বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এম এ কাইয়ুম।
বিশ্লেষকদের মতে, নাহিদের মূল শক্তি তার বিপ্লবের ভাবমূর্তি এবং জামায়াতের শক্তিশালী তৃণমূল কর্মী বাহিনী। তবে, জামায়াতের ওপর এই অতি-নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে এনসিপির স্বাধীন অস্তিত্বকে সংকটে ফেলতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন।
জামায়াত নেতার সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে নারীদের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নাহিদ তা থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। তিনি দাবি করেন, এনসিপি নারী ও সংখ্যালঘু অধিকারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এবারের নির্বাচনে এনসিপি তাদের ৩০ জন প্রার্থীর মধ্যে দুই জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যেখানে জামায়াত একজনও দেয়নি। নাহিদের মতে, যদি জোট সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে কোনো নির্দিষ্ট দলের আদর্শ নয়, বরং জোটের সাধারণ কর্মসূচির ভিত্তিতে দেশ চলবে।
নাহিদ ইসলাম শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার অধিকার দেওয়ার বিপক্ষে অনড় অবস্থানে আছেন। এছাড়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় মর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলছেন তিনি। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে যদি এনসিপি ক্ষমতায় যাওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, তবে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নাহিদ ইসলাম এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তিনি কি পারবেন একটি নতুন ধারার রাজনীতি উপহার দিতে, না কি শেষ পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক শক্তির ছায়ায় বিলীন হয়ে যাবেন- তার উত্তর দেবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট।
সূত্র: আল জাজিরা।