জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকীকরণ ও সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘এয়ারবাস’-এর কাছ থেকে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত চুক্তি সই হয়েছে।
বুধবার, রাজধানীর হোটেল রেডিসন ব্লুতে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বিশ্বমানের এভিয়েশন খাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে জাতীয় এয়ারলাইন্সের আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। নতুন প্রজন্মের এই অত্যাধুনিক উড়োজাহাজগুলো বিমানের বহরে যুক্ত হলে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক রুটগুলোতে বিমান বাংলাদেশ তার শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
তবে শুধু নতুন বিমান কেনাই যে একটি সংস্থাকে সফল করতে পারে না, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মন্ত্রী বলেন, শুধু আধুনিক ও নতুন উড়োজাহাজ কিনে একটি এয়ারলাইনকে সফল করা যায় না। বিমানের আসল উন্নতি ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাদারিত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, কর্মদক্ষতা এবং দায়িত্ববোধের ওপর।
জাতীয় পতাকাবাহী এই প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা ও যাত্রীসেবার মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আসুন, আমরা সবাই মিলে নিরাপত্তা, দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা, সততা ও উৎকর্ষতার এক নতুন কর্মসংস্কৃতি গড়ে তুলি। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই বিমানকে আরও শক্তিশালী, প্রতিযোগিতামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ এয়ারলাইনে পরিণত করতে হবে, যা হবে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের অহংকার ও গর্বের প্রতীক।
চুক্তি সই অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ কোনো দেশ বা পক্ষকে খুশি করার জন্য নয়, নিজেদের প্রয়োজন ও ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনা করেই উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি বলেন, এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তিও কোনো পক্ষকে সন্তুষ্ট করার জন্য নয় বাংলাদেশের বিমান চলাচলের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ব্যবসায়িকভাবে যৌক্তিক হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো চুক্তি করার আগে সেটির ব্যবসায়িক যৌক্তিকতা এবং দেশের প্রয়োজন বিবেচনা করা হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আইনগত কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যাচাই করার পরই চুক্তির পথে এগোনো হয়। ফলে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রয়োজন হলে এয়ারবাসের পাশাপাশি বোয়িংয়ের সঙ্গেও ব্যবসা করতে কোনো দ্বিধা নেই। যে কোনো অর্থনৈতিক খাতে দেশের স্বার্থে ব্যবসায়িকভাবে যৌক্তিক সুযোগ পাওয়া গেলে সরকার তা বিবেচনা করবে।
হুমায়ুন কবির বলেন, উড়োজাহাজ শুধু যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম নয়, এটি একটি দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উড়োজাহাজের মাধ্যমে দেশের মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতের সুযোগ পায়, রপ্তানি পণ্য নতুন বাজারে পৌঁছায়, বিনিয়োগ ও পর্যটন বাড়ে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হয়।
এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তিকে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। নতুন এই সহযোগিতা শুধু উড়োজাহাজ কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে।
১০টি এয়ারবাস কেনার এই বড় পদক্ষেপকে দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। যাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত হলে বিমানের রুট সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব বৃদ্ধিতে তা বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।