হার না মানা তৃতীয় লিঙ্গের শোভার গল্প

অন্য সবার থেকে কিছুটা আলাদা শোভা চৌধুরী। তৃতীয় লিঙ্গের হওয়ায় তার পথ চলাটা মসৃণ ছিলো না। নানান প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ‘শুভ’ হয়ে উঠেছেন আজকের ‘শোভা চৌধুরী’।

শোভা নিজেকে বাংলাদেশের ‘প্রথম’ ট্রান্সজেন্ডার কবি ও লেখিকা দাবি করেন। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার ‘আমি শোভা বলছি’ নামে একটি কবিতার বই। এর আগে ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম বই ‘শ্রাবণ সন্ধ্যা’।

শোভার ভাষ্যে তার লেখা ভালো হলেও শুধুমাত্র ‘সামাজিক বৈষম্য ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল’ হওয়ার কারণে বই ছাপাতে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বইমেলার স্টলগুলোতেও ঠাঁই হয়নি তার বইয়ের। তাই মেলায় ঘুরে ঘুরেই বইটি তিনি বিক্রি করছেন।

শোভা জানতেন নিজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের পরিবর্তন হবে না। নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে। তাই দেশের পড়াশোনার সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছেন, করেছেন সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতকোত্তর।

শোভা বলেন, ‘পড়াশোনাটা করে যেতে হবে এটা মাথায় ছিলো। ২০০৪ সালে এসএসসি পাশ করি, এরপর কৃষি ডিপ্লোমায় ভর্তি হই। ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করে ২০১০ সালে ঢাকায় চলে আসি।’

তিনি রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি বাঙলা কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স করেন সমাজকর্ম বিষয়ে।

শোভা পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকার জন্য চাকরি করেছেন বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায়। তিনি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রে (আইসিডিডিআরবি) এইডস প্রতিরোধক বিষয়ক একটি প্রকল্পে কাজ করেছেন। পরে ‘বন্ধু’ নামক একটি বেসরকারি সংস্থায় একই বিষয়ে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। কোভিড পরবর্তী সময়ে আগের প্রজেক্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কিছুদিন বেকার সময় পার করেন শোভা।

বই লেখার কারণ ‘ব্যাখ্যা’ করতে গিয়ে শোভা বলেন, আমি বই লিখবো তার কোনো ইচ্ছা বা শক্তি আমার ছিলো না। ছোটবেলা থেকে আমি আমার সব কথাগুলো লিপিবদ্ধ করতাম। সেই কথাগুলো কথামালা হয়ে আজ আমার পক্ষে বই লেখা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, আমি ছোটবেলায় খুলনা জেলা শিল্পকলা একাডেমী থেকে নৃত্যকলা, নাট্যকলা শিখতাম। গাঙচিল সাহিত্য সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়ার পর সাহিত্যের জগতে আমার জানাশোনা বাড়তে থাকে। কবিতা আবৃত্তিতে একাধিকবার নিজ জেলার আমি প্রথম স্থান অধিকার করেছি।

শোভা জানান, তিনি ২০১১ সালের ২৩ নভেম্বর ঢাকার ফ্লোটিলায় অনুষ্ঠিত কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় জাতীয়ভাবে প্রথম হন। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী তাকে মেডেল পরিয়ে দেন।

কিশোর বয়সে সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্যুত হয়ে একা সময়ে লেখালেখির অভ্যাস গড়ে ওঠে শোভার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ পড়ে কবিতার জগতে হাতে খড়ি হয় তার। এরপর সংগঠনগুলোর সাথে কাজের পাশাপাশি টুকটাক লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকেন।

বইয়ে কেমন সাড়া মিলছে এমন প্রশ্নের জবাবে শোভা বলেন, ‘হাতেগোনা কয়েকজন পরিচিত ও বন্ধুরা বই কিনলেও মেলায় আসা বেশিরভাগ মানুষই এড়িয়ে যাচ্ছেন। ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে নেতিবাচক ভাবনা আমাদের সমাজে প্রচলিত থাকায় অনেকে আবার তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে এড়িয়ে যাচ্ছেন।’

আরও পড়ুন: বইমেলায় একাত্তর

বই সম্পর্কে বলতে গিয়ে শোভা জানান, তার বইটি উৎসর্গ করেছেন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তার প্রকাশিত দুটো কবিতার বইয়েই কবিতা সংখ্যা ৭১টি। শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে তিনি এ দুটো বই প্রকাশ করেছেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার ইচ্ছে উপস্থাপিকা বা সংবাদ পাঠিকা হওয়ার। লেখক হিসেবে আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। আমি দেশ ও সমাজের জন্য কিছু করে করতে চাই। সবাইকে দেখাতে চাই সমাজের আর দশজন মানুষের মতো আমাদের জীবনও মূল্যবান। একটু সহানুভূতি পেলে আমরাও ভালো কিছু করতে পারি।

 

একাত্তর/আরএ