নব্বই দশকে রাজধানীর অভিজাত পাড়া বনানীতে গড়ে উঠা ট্রাম্পস ক্লাবে বিভিন্ন অপকর্মের প্রতিবাদ করায় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে হত্যা করা হয়েছিলো।
পাশাপাশি ক্লাবে আজিজ মোহাম্মাদ ভাইয়ের সঙ্গে সোহেলের বিভিন্ন ইস্যুতে ঝগড়াও হয়েছিল। আর এসব কারণেই চিত্রনায়ককে খুন হতে হয় বলে জানিয়েছে র্যাব।
১৯৯৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাজধানীর বনানীতে ট্রাম্পস ক্লাবের নিচে সেই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
বুধবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে কাওরান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি বলেন, সোহেল চৌধুরী হত্যার পরিকল্পনা করেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক বান্টি ইসলামের সঙ্গে মিলে পরিকল্পনা করে আশিষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতল চৌধুরী।
ট্রাম্পস ক্লাবে জনসম্মুখে ব্যবসায়ী আজিজ ভাইকে সোহেল চৌধুরী অপমান করায় প্রতিশোধ নিতে তারা এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন।
বনানীর আবেদীন টাওয়ারের অষ্টম তলায় অবস্থিত ট্রাম্পস ক্লাবের পাশে ছিল সে সময়ের বনানীর সবচেয়ে বড় মসজিদ বনানী জামে মসজিদ।
ট্রাম্পস ক্লাবে সন্ধ্যা থেকে শুরু করে সারারাত অসামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। নিহত সোহেল মসজিদের কমিটি নিয়ে ক্লাবের এ ধরনের অশ্লীলতা বন্ধের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
আর এসব নিয়েই আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় সোহেল চৌধুরীর। আজিজ মোহাম্মদ সে সময় নিয়মিত ক্লাবটিতে আসা-যাওয়া করতেন।
গ্রেপ্তার আশিষকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পাওয়া গেছে জানিয়ে র্যাবের মুখপাত্র বলেন, ওই ঘটনায় সোহেলকে ‘উচিত শিক্ষা’ দেয়ার পরিকল্পনা হয়।
আজিজ মোহাম্মদ, আশিষ ও বান্টি মিলে সোহেলকে খুন করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এজন্য তারা যোগাযোগ করেন সেই সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সঙ্গে।
সন্ত্রাসী ইমন ট্রাম্পস ক্লাবে নিয়মিত যাতায়াত করতো। এক পর্যায়ে ইমন তাদের অনুরোধে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে রাজি হন এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেন।
পরে, ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাত তিনটার দিকে বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবের নিচে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে হত্যা করা হয় গুলি করে।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে অভিযান চালিয়ে গুলশানের পিং সিটির পাশে ১০৭ নম্বর রোডের একটি বাসা থেকে সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার আসামি আশিষ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গত ২০ মার্চ সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ তিন জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।
পরোয়ানা জারি হওয়া অন্য দুই আসামি হলেন-ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক আফাকুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলাম ও সেলিম খান।
হত্যাকাণ্ডের পর ভিকটিমের বড় ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। পরে ১৯৯৯ সালের ৩০ জুলাই ৯ জনের বিরুদ্ধে ডিবি আদালতে চার্জশীট দাখিল করে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস আগে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে সোহেল চৌধুরীর কথা-কাটাকাটি হয়। এর প্রতিশোধ নিতে সোহেল চৌধুরীকে হত্যা করা হয়।
বামে: পরিবারের সাথে সোহেল চৌধুরী; ডানে: সোহেল চৌধুরীর মেয়ে লামিয়া চৌধুরী
ঘটনার রাতে সোহেল তাঁর বন্ধুদের নিয়ে ট্রাম্পস ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করেন। এ সময় ভেতরে ঢুকতে তাঁকে বাধা দেয়া হয়। দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে আবারও ঢোকার চেষ্টা করেন।
তখন সোহেলকে লক্ষ্য করে ইমন, মামুন, লিটন, ফারুক ও আদনান গুলি চালান। আসামিদের মধ্যে আদনান খুনের পরপরই ধরা পড়েছিলেন।
আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার আবুল কাশেম ব্যাপারী ১৯৯৯ সালের ৩০ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দেন।
২০০১ সালের ৩০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এ অভিযোগ গঠন করা হয়। অভিযোগ গঠনের পর আসামি আদনান সিদ্দিকী ২০০৩ সালে হাইকোর্টে রিট করেন।
রিটের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ২০১৫ সালের ৫ আগস্ট হাইকোর্ট রুল খারিজ করেন এবং এর আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে রায় দেন।
গত ২৪ মার্চ এ মামলায় আদালতে হাজিরা দেন জামিনে থাকা আসামি ফারুক আব্বাসী। জামিনে থাকা অপর আসামি আদনান সিদ্দিকীর পক্ষ থেকে হাজিরার জন্য সময় চেয়ে আবেদন করা হলে তা মঞ্জুর করেন আদালত।
এছাড়া কারাগারে থাকা আসামি তারিক সাঈদ মামুনকে আদালতে হাজির করা হয়। তবে পলাতক রয়েছেন আসামি আজিজ মোহাম্মদ ভাই, সানজিদুল হাসান, সেলিম খান ও হারুন অর রশিদ। তাঁদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।