হেফাজতের তাণ্ডবে ৮৩ মামলার বিচার হয়নি ৮২টির

রাজধানীর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে কথিত নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবি নিয়ে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ আলোচনায় আসে কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
ওই বছরের ৫ মে ঢাকার ছয়টি প্রবেশমুখে অবরোধ কর্মসূচি শেষে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন হেফাজতের বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক। বাঁশের লাঠি, কাঠের লাঠি, লোহার রড ও দেশীয় অস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্রসহ ইট ও বোমা নিয়ে অবস্থান করা হেফাজতের কর্মী-সমর্থকরা দিনভর বিভিন্ন স্থাপনা ও যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন।
সেদিন মতিঝিল এলাকায় প্রায় আট ঘণ্টা তাণ্ডব চালায় হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাতে বিজিবি, ব়্যাব ও পুলিশের যৌথ বাহিনী মতিঝিলকে ঘিরে অভিযান চালালে পিছু হটে তারা।
পরদিন ৬ মে চট্টগ্রামের হাটহাজারী, নারায়ণগঞ্জ, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনায় ঢাকাসহ সারা দেশে ৮৩টি মামলা হয়। এগুলোর মধ্যে এ বছর পর্যন্ত ২৯টি মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হলেও বাকি ৫৩ মামলার তদন্ত স্থবির হয়ে পড়ে। যেসব মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিচার কার্যক্রমও অনেকটা স্থবির হয়ে আছে। তবে বাগেরহাটের একটি মামলার রায় হয়, তাতে সব আসামি খালাস পান।
২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে দায়ের করা এসব মামলার বেশির ভাগেরই তদন্ত শেষ হয়নি। যেসব মামলার চার্জশিট হয়েছে সেগুলোর বিচারেও কোনো অগ্রগতি নেই।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে হেফজতের তাণ্ডবের ঘটনায় ৮৩ মামলার মধ্যে রাজধানীতে ৫৩টি মামলা হয়। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার ও লক্ষ্মীপুরে ৩০টি মামলা করা হয়। এসব মামলায় হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির, নেজামে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়।
মামলায় তিন হাজার ৪১৬ জনের নামসহ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে আসামি করা হয়। হেফাজতের তৎকালীন আমির শাহ আহমদ শফীকে কোনো মামলায় আসামি করা হয়নি। পরে হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তারা জামিনে মুক্তি পান।
২০১৩ সালের ৫ মে দিনভর তাণ্ডবের পরদিন ৬ মে রাত ৮টার দিকে হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ গ্রেপ্তার করে। বাবুনগরীকে কয়েক দফা রিমান্ডে নেওয়ার পর ২১মে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি হত্যা মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ওই জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘হুজুরকে (আল্লামা আহমদ শফী) ভুল বুঝিয়ে এই সমাবেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় আরেক পক্ষ; যারা মূলত ১৮ দলীয় জোটের অনুসারী।’
বাবুনগরী স্বীকারোক্তিতে আরও বলেন, ‘তিনি ঘটনার দিন বায়তুল মোকাররমে দুপুরের দিকে ছিলেন। তিনি হেফাজতের কর্মীদের শান্ত করার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় তিনি সেখান থেকে লালবাগে একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নেন।’
রাজধানীর পল্টন ও মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাওয়ায় তিনি হেফাজত নেতা মাওলানা নূর হোসেন কাসেমী, মাওলানা মুফতি ফয়জুল্লাহ, আবুল হাসনাত আমিনী, মোস্তফা আযাদ, মাওলানা শাখাওয়াত হোসেন, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মাওলানা গোলাম মহিউদ্দীন ইকরাম, শেখ লোকমান হোসেন, মাওলানা মাইনুদ্দীন রুহী, শামসুল আলম, আজিজুল হক ইসলামাবাদী, আমানুল ক্বারী ফজলুল ক্বারী জিহাদী, মুফতি হারুন এজাহারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এবং ওই সব বন্ধ করার জন্য বলেন। ওই সব নেতা সহিংসতা বন্ধ না করে চুপ থাকার কথা বলেন এবং এমন কথাও বলেন যে ‘আমাদের আন্দোলন এখন আর শুধু ১৩ দফার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন এটা হবে সরকারপতনের আন্দোলন। এখন আমাদের ১৮ দলের লোকজন সব ধরনের সহায়তা করবে। অর্থ দেবে, খাবার ও পানি দেবে। ১৮ দলের নেতাদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিবের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অন্য হেফাজত নেতার নাম সুস্পষ্ট থাকা এবং এর পেছনে কারা কারা জড়িত তাদের নাম থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগ মামলায় এখনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।
আদালত সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে করা ৫৩টি মামলার মধ্যে ৪টির অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, বাকি ৪৯টির তদন্ত শেষ হয়নি।

একাত্তর/এসি