যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দীর্ঘদিনের পলাতক আসামি কেএম আমিনুল হক ওরফে রজব আলী’কে রাজধানীর কলাবাগান থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
শনিবার (২ জুলাই) রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে রোববার (৩ জুলাই) কারওয়ানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব জানায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর কে এম আমিনুল হকের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও লুটপাটসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি অভিযোগ আনা হয়।
২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর বর্ণিত অভিযোগের তদন্ত শেষে তদন্ত সংস্থা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ১৮ মে ট্রাইব্যুনাল আমিনুল হকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন এবং ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর কে এম আমিনুল হক ওরফে রজব আলী’কে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ প্রদান করেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত এই পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে র্যাব। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাতে র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-২ এর আভিযানিক দল রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি কে এম আমিনুল হক ওরফে রজব আলীকে গ্রেপ্তার করে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, আমিনুল ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বিপক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়ে কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ এলাকায় বাংলাদেশের নিরীহ মুক্তিকামী মানুষকে হত্যাসহ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হতে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত গণহত্যা, নির্যাতনসহ মনবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করে। সে ভৈরবে একটি কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় পাকিস্তানি ইসলামি ছাত্রসংঘ এর কলেজ শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সে ভৈরবে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তা করার জন্য এলাকায় ‘আলবদর’ বাহিনী গঠন করে এবং কিশোরগঞ্জ জেলার কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাথে নিয়ে হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানার কৃষ্ণপুর, গদাইনগর ও চন্ডিপুর গ্রামে এবং কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম থানার সদানগর ও সাবিয়ানগর গ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর থানার ফান্দাউক এলাকায় গণহত্যা, লুটপাট, ঘরবাড়ি লুণ্ঠন ও নির্যাতন করে। এছাড়াও, স্বাধীনতাকামী নিরীহ বাঙ্গালিদের অপহরণ পূর্বক রাজাকার ক্যাম্পের টর্চার সেলে নির্যাতন করে হত্যা করে।
র্যাব জানায়, আমিনুল ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। ১৯৭২ সালে তার বিরুদ্ধে অষ্টগ্রাম থানায় দালাল আইনে তিনটি মামলা রুজু হয়। উক্ত মামলা সমূহে তার ৪০ বছর সাজা হয় কিন্তু রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমায় ১৯৮১ সালে মাত্র ১০ বছর সাজা ভোগ করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পায়। এরপর ১৯৮২ সালে সে জেল থেকে বের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে ও বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকবার পাকিস্তান গমন করে। ১৯৯৭ সালে সে নিজ এলাকা ত্যাগ করে ঢাকায় চলে আসে।
২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করা হলে সে আত্মগোপনে চলে যায়। এ সময় সে গ্রেপ্তার এড়াতে রাজধানীর ধানমণ্ডি ও কলাবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার বাসা পরিবর্তন করতে থাকে। আত্মগোপনে থাকাকালে সে সাধারণত জনসমাগম স্থান, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ছাড়াও তার ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ পায় এমন স্থান এড়িয়ে চলত।
আরও পড়ুন: নড়াইল থানার ওসি প্রত্যাহার
আমিনুল “আমি আলবদর বলছি” ও “দুই পলাশী দুই মীরজাফর” নামে দুইটি বই প্রকাশ করে। যেখানে সে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৯৭৫ সালের শোকাবহ ১৫ আগস্টের দিনসহ সামগ্রিক বিষয়গুলো অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আত্মস্বীকৃতি হিসেবে নিজেকে “আলবদর কমান্ডার” দাবী করে। অতঃপর ২০১৪ সালে তার প্রকাশিত “দুই পলাশী দুই মীরজাফর” বইটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য সন্নিবেশ করায় সরকার কর্তৃক বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় একটি মামলা রুজু হয়।
তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
একাত্তর/এসজে