রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানের সিদ্দিক বাজারে বিআরটিসি বাস কাউন্টারের পাশে একটি ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল থেকে একের পর এক হতাহত মানুষকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে বাড়ছে বিস্ফোরণে লাশের সংখ্যা। নিহত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৭ মার্চ) বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে গুলিস্তানে সিদ্দিক বাজারে বিআরটিসি বাস কাউন্টারের পাশে একটি ভবনে বিস্ফোরণে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১২০ জন। তাদের মধ্যে ৯০ জনকে ঢামেকের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
ঠিক কি কারণে এই বিস্ফোরণ ঘটেছে সে সম্পর্কে এখনও কোন ধারনা পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। পাশাপাশি ভবনে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে ফায়ার সার্ভিসের ১১ ইউনিট। তারা ভবনে হতাহতদের খুঁজছেন।
বিস্ফোরণে পাশাপাশি থাকা একটি সাত তলা ও একটি পাঁচ তলা ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাত তলা ভবনের তৃতীয় তলায় বিস্ফোরণ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তৃতীয় তলার দেয়ালসহ বিশাল অংশ ভেঙ্গে রাস্তার উপর পড়েছে। দোতালার দেয়ালও ধসে গেছে।
পাশের সাত তলা ভবনের সামনের দিকের সবগুলো জানালার কাঁচ ভেঙ্গে গেছে। বিষ্ফোরণের কারণে ভেঙ্গে পড়া দেয়াল, আসবাবপত্র, স্যানেটারি সামগ্রী ও কাঁচের টুকরোয় ভরে যায় নিচের সড়ক। এসবের আঘাতে আহত হয়েছেন অনেক পথচারী ও গণপরিবহনের যাত্রীরা।
ভয়াবহ এই বিস্ফোরণের ঘটনায় সাত তলা ভবনের তিন তলা পুরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাশের কয়েকটি ভবনও। এরইমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। নাশকতা না জমে থাকার গ্যাসের কারণে বিস্ফোরণ তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিস্ফোরণের ভয়াবহতা এত বেশি ছিল যে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো এলাকা। ভয়াবহ এ বিস্ফোরণের ঘটনায় দেয়াল ভেঙে রাস্তায় এসে পড়ে। এই সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক থাকা গাড়ি ও গণপরিবহনও। সড়ক থেকে ভেঙ্গে পড়া ধ্বংসাবশেস অপসারণ করা হচ্ছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে গুলিস্তান থেকে নর্থ-সাউথ রোড পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। বহু অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থল থেকে আহতদের হাসপাতালে নেয়ার কাজ করছে। এ ছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়রাও উদ্ধার কাজে যোগ দিয়েছে।
ঠিক কি কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেটি অনুমান করা গেলেও, বিকট শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ঘটনাস্থলে থাকা মানুষরা। তারা বলছেন, হঠাৎ বিকট শব্দের পর সড়কের ওপর নেমে আসতে থাকে ইট ও কাঁচের টুকরোসহ নানা ধরনের বস্তু।
ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসা নেয়া বিস্ফোরণে আহত রিকশাচালক লিটন হোসেন বলেন, দুজন যাত্রী নিয়ে নাজিরা বাজার থেকে বায়তুল মোকাররম যাচ্ছিলেন। সিদ্দিক বাজারের বিআরটিসি বাস কাউন্টারের কাছে আসার পর পাশের ভবনে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে ভবন থেকে ইটসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র রাস্তায় উড়ে এসে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, বিস্ফোরণের ধাক্কায় যাত্রীসহ রিকশা নিয়ে উল্টে পড়ে তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন। ভবনটি থেকে ইটসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তার ওপর পড়ায় মাথায় চোট পান তিনি। পরে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে আসেন।
ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগের সামনে এক পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে বসে থাকা রাজীব বলেন, যেখানে ঘটনা ঘটছে, তার পাশেই ছিলাম আমি। অনেক বড় আওয়াজ হয়েছে। হঠাৎ কিছুর আঘাতে পায়ে ব্যথা পেয়ে পড়ে যাই। এরপর আর কিছু মনে নেই।
সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত কামাল আহমেদ বলেন, ফুটপাতে বেল কিনছিলাম। এমন সময় হঠাৎ বিকট একটা আওয়াজ হলো। শব্দে শুনে আমি পড়ে গেলাম। আমার হাতে বাজারের ব্যাগ ছিল। সেখানে বাসার জন্য বাজার ছিল। সব পড়ে গেছে।
তিনি আরও স্মরণ করেন, দেখি পুরো এলাকায় ধোঁয়া। কোনো ভবন দেখা যাচ্ছে না। সব মানুষ খালি দৌড়াচ্ছে। আমিও ব্যাগটা কোনো রকমে নিয়া আস্তে আস্তে চলে আসছি। বাবুবাজারে তাঁর অফিস থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে গুলিস্তানে পৌঁছানের পর বিস্ফোরণে আহত হন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শী দোকানদার সাফায়েত হোসেন বলেন, প্রথমে বিকট শব্দ শুনি। পরে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে ২০-২৫ জনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে জখম থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। বাঁচাও, বলে চিৎকার করছিলেন। আতঙ্কে ছোটাছুটি করছিলেন অনেকে।
তিনি আরও বলেন, বিস্ফোরণের সময় এখানে পুরো সিদ্দিক বাজার এলাকা কেঁপে ওঠে। প্রথমে ভেবেছিলাম ভূমিকম্প হচ্ছে। সবার চোখেমুখে আতঙ্ক। ভবনের জানালার কাচ ভেঙে রাস্তায় পড়ে। পথচারীরাও এতে আহত হয়।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যালে একটু পরপর অ্যাম্বুলেন্স আসছে। কোনোটা থেকে লাশ নামানো হচ্ছে। কোনোটা থেকে আহত ব্যক্তিদের নামানো হচ্ছে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়। লাশ দেখেই স্বজনের খোঁজে আসা মানুষেরা কান্নায় চিৎকার করে উঠছেন।
ভয়াবহ বিস্ফোরণে পাশাপাশি দুটি বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি ভবন সাত এবং আরেকটি ভবন পাঁচতলা। এর মধ্যে সাততলা ভবনের বেসমেন্ট, প্রথম ও দ্বিতীয় তলা বিধ্বস্ত হয়েছে। আর পাঁচতলা ভবনের নিচতলাও বিধ্বস্ত হয়েছে। এর দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা ব্র্যাক ব্যাংক শাখা।
একাত্তর/এআর