বঙ্গবাজারের আগুনে কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ

আগুনে পোড়া বঙ্গবাজার যেন ভাঙারির স্তুপে পরিণত হয়েছে। পোড়া কাঠ, লোহা বা টিন যা কিছু অবশিষ্ট আছে সেটাই বিক্রি হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীরা নয়, অসংখ্য মানুষ যে যেভাবে পারছে তা কুড়িয়ে নিয়ে বিক্রি করছে। আর, ব্যবসায়ীরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছেন। তারা বলছেন; সর্বশান্ত হবার পর চোখের সামনে এমন লুটপাট তাদের হতবাক করেছে। 

রাজধানীর বঙ্গবাজারে সাতটি দোকান ছিলো মিজানুর রহমানের। নিউ রাজু গার্মেন্টসে নামে যত দোকান আছে সবগুলোর মালিক তিনি। বঙ্গবাজারের বড় ব্যাবসায়ীদের একজন। তিনি জানালেন, আগুনের পুড়েছে প্রায় সাত কোটি টাকার পণ্য। সাথে জরুরি বেশ কিছু কাগজপত্র। যাতে ছিলো বাকিতে বিক্রি করা মালের হিসাব। একদিনের ব্যবধানে এসব কিছুই এখন ছাইভস্ম। 

আগুনের লেলিহান শিখায় বঙ্গবাজারের আকাশে রুটি রুজির সবটুকু মিলিয়ে যাবার পর সেখানেই এখন শুরু হয়েছে নতুন উৎপাত। দেখে মনে হতে পারে বঙ্গবাজারের ক্ষতিগ্রস্থ ব্যাবসায়ীরা বুঝি পোড়া ছাইয়ের মধ্যে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু খুঁজছেন। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, যে যার মতো পোড়া লোহা, তালা, মেশিন নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। 


আগুনে হাজারো দোকান ভষ্মীভূত হওয়ার সময় এক শ্রেণির মানুষ লুটপাট চালিয়েছে বলে দাবি করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। আর পুড়ে ছাই হবার পর তারা দেখছেন সেই একই দৃশ্য। ব্যবসায়ীরা যখন সব হারানরো আহাজারি করছেন, তখন একদল মানুষ দোকানের অবশিষ্ট সব কিছু তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। যাকে রিতিমতো লুটপাট বলছেন বঙ্গবাজারের ব্যাবসায়ীরা। 

বঙ্গবাজারের কাপড় ব্যবসায়ী একরাম বলেন, লাখ টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিছু বের করে আনতে পারছি, আবার সেগুলো চুরি হয়ে গেছে। ঈদের জন্য সব পুঁজি খাটায়ে নতুন মালামাল তুলছিলাম, সব আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। খালতো ভাইয়ের দোকান থেকে যা বের করে আনছি, তাও চুরি হয়ে গেছে। এক আগুনের কত ধরনের বিপর্যয়।

তারা বলছেন, মানুষের মানবিকতা হারিয়ে গেছে। এমন দূর্যোগেও এক শ্রেনীর মানুষ জিনিসপত্র লুটে নিতে ব্যস্ত। উদ্ধারকর্মী ও ব্যবসায়ীরা যখন উদ্ধারকাজে ব্যস্ত; ঠিক তখনই লুটে ব্যস্ত এক শ্রেণির লোক। অসহায় ব্যবসায়ীদের সামনেই নিয়ে যাচ্ছেন দোকানের লোহা, কাপড়সহ অবশিষ্ট মালামাল। যে যা পারছেন লুটে নিয়ে চলে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, সেসব বিক্রিও করে দিচ্ছেন।


পুলিশের ব্যারিকেড গলিয়ে যে যেভাবে পারছেন বেরিয়েও যাচ্ছেন। তাদের অনুসরণ করতেই দেখা গেলো সামনেই আরেক দল অপেক্ষায়। এরা পোড়া মালামালের ক্রেতা। লুট করে নিয়ে আসে লোহা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ভাঙ্গারির দোকানে। বিকোচ্ছে ২০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে। যদিও একাত্তর টিভির ক্যামেরার সামনে কেউ স্বীকার করতে চান না।

কিছু অসাধু মানুষ আবার সহযোগিতার নামেও চুরি করে পালাচ্ছে। এ যেন কারও পৌষ মাস আর কারও সর্বনাশ। ধ্বংস্তূপ থেকে লোহা তোলা একজনের অদ্ভূত যুক্তি। জানান, আগুনে পুড়ে যাওয়া এসব পড়ে আছে। তাই নিয়ে যাচ্ছে তারা। এতে যদি দুই চার টাকা আয় করা যায় ক্ষতি কি। একই ধরনের যুক্তি দিচ্ছেন লুটেরা দলের বেশিরভাগ সদস্য। 

রনি নামের এক দোকানি বলেন, আমাদের রক্ত পানি করে এই দোকান গড়ে তুলেছিলাম। এখন তারা সবকিছু নিয়ে কেজি দরে বিক্রি করে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। একই ভাষায় আরেক ব্যবসায়ী রবিন বলেন, স্থানীয় জনগণ ও টোকাই শ্রেণির মানুষরা সাহায্য করার পরিবর্তে সব কিছু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। কোনো বাধাই মানছে না। চেয়ে চেয়ে দেখছি আমরা।

শুধু ছাইয়ের ভেতর থেকে দোকানের লোহা-তামা চুরি করাই নয়, আগুন লাগার পর যারা কিছু মালামাল উদ্ধার করে রাস্তায় রেখেছিলেন, সেগুলো কেটে কাপড় চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে একদল দুর্বৃত্ত। ব্যবসায়ী আজমল বলেন, যে যার মতো দোকানের গাইট (কাপড় বোঝাই বড় বস্তা) বের করে নিয়ে গেছে। দোকানদারদের সঙ্গে বাইরের মানুষও ঢুকছে। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক ব্যবসায়ী আগুন থেকে রক্ষা পাওয়া কিংবা কিঞ্চিৎ পুড়ে যাওয়া মালামাল মাথায় করে সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দিকে নিয়ে গিয়ে জড়ো করছেন। রেখেছেন রাস্তার ফুটপাতের উপর। কিন্তু সেসব মালামালও চুরি করে নিয়ে গেছে কে বা কারা। অথচ এ সম্পর্কে পুলিশের  লোকজন কোন ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। 

এদিকে, আগুন লাগার পরের দিনও মালামাল সরাতে বেগ পেতে হচ্ছে উৎসুক জনতার ভিড়ে। আজও পুড়ে যাওয়া এ মার্কেটের সামনে ভিড় করেছেন সাধারণ মানুষ। এমনকি ব্যবসায়ীদের পরিবার-পরিজন নিয়ে আগুনে পুড়ে যাওয়া দোকানগুলো দেখতে এসেছেন অনেকেই। স্বেচ্ছাসেবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষেধ অমান্য করেই ভিড় জমাচ্ছেন তারা।

 এর আগে মঙ্গলবার সকালে বঙ্গবাজারে আগুন লাগে। সকাল ৬টা ১০ মিনিটে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় তারা। পরে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ৫০টি ইউনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনে সেখানকার সাতটি মার্কেটের এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজারের বেশি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।


একাত্তর/এআর