নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট হলে আওয়ামীলীগ ১০টির বেশি আসন পাবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামআলমগীর। খুলনায়বিভাগীয় গণসমাবেশে তিনি বলেন, কোনো বিদেশি শক্তি আওয়ামী লীগকেআর ক্ষমতায় রাখতে পারবে না। এ সময়গণসমাবেশে আসতে বাধা দেয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ভাত ও ভোটেরঅধিকার যারা কেড়ে নিয়েছে তাদের গণআন্দোলনেই বিদায় করতে হবে।
খালেদা জিয়ার স্থায়ী মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেনির্বাচনের দাবিতে শনিবার দুপুর সোয়া ১২টায় খুলনার নগরীর ডাকবাংলো সোনালী ব্যাংক চত্বরেশুরু হয় বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ। প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন খুলনা ও আশেপাশের বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীরা। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় অনেকে সমাবেশ যোগদিয়েছেন হেঁটে, অনেকে অটোরিক্সায় চড়ে। এসময় গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়ায় ক্ষোভজানান বিএনপি নেতাকর্মীরা।
পরে বিকেল সোয়া চারটার দিকে সমাবেশ মঞ্চে প্রধানঅতিথির বক্তব্য দেয়া শুরু করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল। এ সময় তিনি বলেন, সরকার জেনে গেছে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে পরাজয় নিশ্চিত। আর, কোনো বিদেশি শক্তি আওয়ামী লীগকেক্ষমতায় রাখতে পারবে না। গণঅভ্যুত্থানেএ সরকারকে বিদায় জানাতে হবে। ফয়সালা হবে রাজপথে। এখনও সময় আছে সেইফ এক্সিট নেন।পালাবার পথে খুঁজে পাবেন না।
অসুস্থ বোধ করায় চেয়ারে বসে বক্তব্য দেন, বিএনপিমহাসচিব। তিনি শনিবার বিকেল ৪টা ১৭ মিনিট থেকে ৪টা ৪৮ মিনিট পর্যন্ত বক্তব্য দেন। খুলনাবাসীকেঅভিবাদন জানিয়ে তিনি বলেন, এই সভা প্রতীক মাত্র। খালেদা জিয়ারচেয়ার খালি। তিনি গৃহবন্দি। তাঁর স্মরণে এই চেয়ার খালি। জনতার সৈনিক, জনগণের অধিকার ফিরিয়ে নিয়ে আসো। এই দেশকে নরকে পরিণত করেছে সরকার। সবঅর্জন ধ্বংস করে ফেলেছে। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে এসব করছে সরকার।
শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকার জন্য সরকার দেশকে নরকে পরিণতকরেছে উল্লেখ করে সমাবেশে মির্জা ফখরুল বলেন, খুলনাকে দেশ থেকেবিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য জন্য আপনারা অসাধ্য সাধনকরেছেন। আপনাদেরকে আমি স্যালুট জানাই। সব বাধা উপেক্ষা করে হাজার হাজার নেতা-কর্মীসমাবেশে যোগ দিয়েছেন। খুলনার সমাবেশে আসতে বাধা দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন,পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ সময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, খুলনা নগরীর রেলস্টেশনে নেতাকর্মীদের মারধর করেছে। রামপাল, কাটাখালিতে হামলা হয়েছে, রূপসা ঘাটে হামলা হয়েছে,জেলখানা ঘাটেও হামলা হয়েছে। এত মানুষ আহত হলো, এত মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হলো কেন? শুধুমিটিং বন্ধ করার জন্য?
সরকার গণপরিবহন বন্ধ করে, নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে, গ্রেপ্তার করেওখুলনায় বিএনপির সমাবেশ একটুও রুখতে পারেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ভেবেছিল খালেদা জিয়াকে জেলে দিলে বিএনপি শেষ হয়ে যাবে। তবে না,বিএনপি নতুন সাহসে বলীয়ান হয়ে উঠেছে। এই জনসমুদ্র তারই প্রমাণ।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে নতুন রেকর্ড, ৯২২ রোগী হাসপাতালে, মৃত্যু দুই
মির্জা ফখরুল বলেন, এই নির্বাচনকমিশন নিজেদের ভালো দেখানোর জন্য কৌশল নিয়েছে। কমিশনকে তো ডিসি-এসপিই মানে না।তাই আমরা নির্বাচন কমিশন নিয়ে কথা বলছি না। তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়।তাই এই সরকারকে বিদায় জানাতে হবে। মামলা ও হামলায় বিএনপিকে দমানো যাবে না। নতুনসাহস নিয়ে আন্দোলন করছে বিএনপি।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, সরকার বলছেদুর্ভিক্ষের পদধ্বনির কথা। কারণ তারা লুটপাট করছে। সরকার বলছে সমাবেশে সহায়তারকথা। স্বরাষ্ট্র্রমন্ত্রী কি সহায়তা করেছেন, রেলস্টেশনেগ্রেপ্তার হামলা করা হয়েছে। আপনারা দমিয়ে রাখতে পারবেন না। বিএনপি নতুন সাহসেবলীয়ান, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের বয়স হয়েছে তারপরও লড়াইকরছি। মূল দায়িত্ব তরুণদের উপরে, লড়াইয়ে জিততে হবে। আমরাশান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করছি, সহিসংসতা করছি না।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এস এমশফিকুল আলম মনা। বিশেষ অতিথি ছিলেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, শামসুজ্জামান দুদু প্রমুখ।
নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, খুলনায়বিএনপির সমাবেশে বাধা দিয়েও ঠেকাতে পারেনি। সমাবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেসরকার দলীয় নেতাকর্মীরা ও পুলিশ। কিন্তু লাভ হয়নি। খুলনা বিভাগের প্রান্তরেপ্রান্তরে জনস্রোত সৃষ্টি হয়েছে।’
এর আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্ররায় বলেন,যুদ্ধটা পুলিশের বিরুদ্ধে না। পুলিশ বাহিনীকে বুঝতে হবে। পুলিশজনগণের টাকায় চলে জনগণের সেবা করার জন্য। পুলিশ বাহিনী প্রধানমন্ত্রীর বাসারচাকর-বাকর না যে, যা বলবে তাই শুনতে হবে। ভয় পাবেন না,সরকারের কোনও অন্যায় আদেশ পালন করবেন না।
খুলনা বিভাগীয় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকঅনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমাদের খুলনায় গণসমাবেশে জনসমুদ্রআর এই বিশাল আয়োজন দেখে বিস্মিত তারেক রহমান। তিনি কিছুক্ষণ আগে দলের মহাসচিবকে একথা জানিয়েছেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, এই সরকার খুব বেশি দিন নাই। এ বছর যায় কি যায় না। আমাদের নেতা–কর্মীরাঅনেক কষ্ট করেছেন। আর বেশি দিন কষ্ট করা লাগবে না। অনতিবিলম্বে এই সরকার পদত্যাগেবাধ্য হবে। কেয়ারটেকারের অধীনে নির্বাচন হবে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনেবসবেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
সরকার এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের উদ্দেশ্যে বিএনপির এইনেতা বলেন, যদি সত্যিকারের ইলেকশন হয়, আপনারা১০টার বেশি আসন পাবেন কি না, সন্দেহ আছে। সময় থাকতে বেগমজিয়াকে মুক্তি দেন। তারেক রহমানকে সসম্মানে দেশে আসার সুযোগ দেন। যারা জেলে আছেমুক্তি দেন। ১ লাখ মামলায় যে ৩৬ লাখ আসামি করেছেন, সেসবমামলা প্রত্যাহার করেন। না হলে আজ জনতা বিচারের জন্য তৈরি আছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান সমাবেশেবলেন,আগামী কোনো নির্বাচন হতে হলে আওয়ামী লীগের অধীনে তা হবে না। খুলনারমানুষ প্রমাণ করছে তারা এ সরকারকে ভয় করে না। সরকার চেয়েছিল মানুষকে ভয় দেখিয়ে এদেশ থেকে গণতন্ত্র হরণ করতে, মানুষের ভোটের অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার হরণ করতে। তারা পারেনি, ব্যর্থহয়েছে।
সমাবেশে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকঅনিন্দ্য ইসলাম বলেন, দুই দিন ধরে খুলনা বিভাগের মানুষকেপিঁপড়ার মতো হেঁটে হেঁটে সমাবেশে উপস্থিত হতে হয়েছে। কখনো গাড়িতে, কখনো ট্রেনে, কখনো মোটরসাইকেলে, কখনো নছিমনে বা হেঁটে এখানে এসেছেন। অনেকে হামলার শিকার হয়েছেন। পথে পথেবাধা পেয়েছেন।
এদিকে খুলনা রেলস্টেশন এলাকায় দুপুরে পুলিশ ও বিএনপিরনেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের হয়। দলেরনেতাকর্মীরা জানান, সমাবেশে যেতে বাধা দেয়াকে কেন্দ্র করেসংঘর্ষ হয়।
একাত্তর/এসি/আরবিএস